আনোয়ারা-কর্ণফুলী জমির দাম বেড়েছে মৌজা রেটের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি

রাজিব শর্মা, চট্টগ্রাম অফিসঃ আনোয়ারায় জমির দাম বেড়েছে কয়েকগুণ
টানেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়া ও এশিয়ান হাইওয়ে যাওয়ার ঘোষণায় আনোয়ারায় রাতারাতি বাড়ছে জমির দাম। বৈরাগ, বেলচূড়া, বটতলী, হাজীগঞ্জ ও তৈলারদ্বীপ এলাকায় জমির দাম আগের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হাঁকাচ্ছে বিক্রেতারা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় শিল্পমালিকরাও ঝুঁকছেন আনোয়ারার দিকে। তাই বাড়ছে শহরের সঙ্গে লাগোয়া নদী তীরবর্তী এ উপজেলার জমির দাম।
১৬ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক অঞ্চল, সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার টানেল ও আড়াই হাজার কোটি টাকায় যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে আনোয়ারায়। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে এসব উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেন।

এ প্রসঙ্গে আনোয়ারার সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলেন, ‘আনোয়ারার আর্থসামাজিক উন্নয়নে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপজেলা দিয়ে কক্সবাজারে যাবে এশিয়ান হাইওয়ে। তাই বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন আনোয়ারার দিকে। এ সুযোগে এখানকার জমির দামও বাড়িয়ে নিচ্ছেন জমির মালিকরা।’ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোঃ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘আনোয়ারায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ৭৭৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছিল জেলা প্রশাসক থাকাকালীন । মৌজা দরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামেই অধিগ্রহণ করতে হয়েছিল এসব ভূমি।’

!-- Composite Start -->
Loading...

জামাল উদ্দিন জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য মৌজাদরের চেয়ে ভূমির মালিকদের দেড় গুণ বেশি দাম দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বৈরাগ, বেলচূড়া, হাজীগঞ্জ, বটতলী ও তৈলারদ্বীপ এলাকায় ভূমির দাম বেশি বাড়ছে। বৈরাগে এখন ১ শতাংশ জমির মৌজাদর এখন এক লাখ ৪১ হাজার ১২১ টাকা। বেলচূড়ায় এক লাখ ১২ হাজার ১৫ টাকা, বটতলীতে ৫৭ হাজার ১৫০ ও হাজীগঞ্জে ৫৮ হাজার ৯১৪ টাকা। সরকারকেও এসব এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ করতে অনেক বেশি দাম দিতে হয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো শিল্প গ্রুপ জমি কিনতে গেলে মৌজাদরের চেয়ে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন জমির মালিকরা। সিইউএফএল সড়ক, আনোয়ারা-বাঁশখালী সড়ক ও বটতলী সড়কের আশপাশে কোনো কোনো জমি প্রতি শতক বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়।

অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বৈরাগ, বটতলীসহ চারটি ইউনিয়নে ৭৭৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। এশিয়ান হাইওয়ের সড়ক যাবে বৈরাগ ত্রিপল সড়ক থেকে দক্ষিণে বটতলী হয়ে। এ মহাসড়কের আরেকটি অংশ থাকবে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পটিয়ার পিএবি সড়কে। এরই মধ্যে চাতরি ইউনিয়নে সড়ক সংস্কারে কাজও শুরু হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য রায়পুর, জুঁইদণ্ডী, বারখাইন, হাইলধর ও পরৈকোড়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধও সংস্কার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এসব ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ উন্নয়নে ২৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস করেছে একনেক। তাই দাম বাড়ছে এসব ইউনিয়নের জমিরও। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায়

এরই মধ্যে আনোয়ারায় শিল্পকারখানাও স্থাপন করতে শুরু করেছে বিভিন্ন গ্রুপ। পিএইচপি গ্রুপ আনোয়ারায় তৈরি করছে প্রোটন গাড়ির কারখানা। ৪০০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। সাদ-মুছা গ্রুপ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আগাম কিনে রেখেছে জমি। এস আলম গ্রুপেরও অনেক জায়গা কেনা আছে আনোয়ারায়। এভাবে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান কিনতে থাকায় আনোয়ারায় জমির দাম বাড়ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, সিইউএফএল, ডিএপি ও কাফকো সার কারখানা হওয়ার পর থেকেই আনোয়ারায় বাড়তে থাকে জমির দাম। কেইপিজেড হওয়ার পর রাতারাতি কয়েক গুণ বাড়ে আশপাশের এলাকার জমির দাম। এখন অর্থনৈতিক অঞ্চল, টানেল ও এশিয়ান হাইওয়ে হওয়ার ঘোষণায় আরেক দফা বেড়েছে জমির মূল্য।

চট্টগ্রামের সঙ্গে নদীর ওপারে থাকা আনোয়ারাকে এক সুতোয় গাঁথবে কর্ণফুলীর টানেল। সাড়ে আট হাজার কোটি টাকায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ টানেলের নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০২০ সালের মধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। ১৪ অক্টোবর এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন চীনা রাষ্ট্রপতি। টানেলে যাতায়াতের সুবিধার্থে কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে নির্মিত হবে সাত কিলোমিটার সংযোগ সড়কও। এই টানেলের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, বান্দরবান ও টেকনাফের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তাই টানেলের আশপাশের এলাকায় বেড়ে গেছে জমির দাম। একই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক অঞ্চলের আশপাশে থাকা জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রেও। জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ইলেকট্রিক ও ইলেট্রনিকস পণ্যসামগ্রী, ফার্নেস ও সিমেন্টশিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে এখানে ৩৭১টি শিল্পকারখানা স্থাপন করবে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। এটি বাস্তবায়িত হলে ৫৩ হাজার ৪২০ জনের কর্মসংস্থান হবে। কেইপিজেডের আশপাশে থাকা ভূমির দামও বেড়েছে।

জানা গেছে, টানেল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ছাড়াও আনোয়ারায় গড়ে তোলা হচ্ছে বর্জ্যশোধন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, এলএনজি টার্মিনাল ও ২০ তলাবিশিষ্ট বেজা ভবন। এ জন্য দুই হাজার ২৪৫ কোটি টাকার আলাদা একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব গেছে চীনের কাছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রস্তাবটি দূতাবাসের মাধ্যমে চীন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আনোয়ারা শিল্প জোনে থাকা শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন করতে সিপিটি তৈরি করা হবে। শিল্পকারখানা ও আশপাশের এলাকায় থাকা মানুষের নিরবচ্ছিন্ন পানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কালুরঘাট থেকে পরিশোধিত পানি আনোয়ারায় নেওয়ার চিন্তাভাবনা আছে। বিদ্যুতের বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে নির্মাণ করা হবে স্বতন্ত্র সাব-স্টেশন। বিকল্প জ্বালানির জন্য মহেশখালী থেকে আনোয়ারায় ৯১ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন টানা হচ্ছে। ২৬ জানুয়ারি শুরু হওয়া এ কাজ আগামী বছরের জুন-জুলাইয়ে শেষ হবে। অত্যাধুনিক শিল্পপল্লী গড়ে তুলতে আনোয়ারার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে ২০ তলাবিশিষ্ট টাওয়ার নির্মাণ করবে বেজা। এসব উন্নয়ন পরিকল্পনার কারণেই আনোয়ারায় জমির দাম দ্রুত বাড়ছে।

মতামত দিন

Post Author: newsdesk

A thousand enemies is not enough; a single enemy is. There is nothing as a ‘harmless’ enemy.