আওয়ামী লীগের প্রচারে উন্নয়ন, বিএনপির প্রাধান্য জাতীয় ইস্যু

0
364
city_corporation

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর এখন মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো। নিজ দলের প্রার্থীকে নগর ভবনে নিতে লড়াইয়ের ছক কষতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রার্থীরা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় নির্বাচন হলেও জাতীয় ইস্যুকে সামনে তুলে এনে নির্বাচনী মাঠ সরব রাখতে চাইছে বিএনপি। অন্যদিকে বিগত ১২ বছরে উন্নয়নের ফিরিস্তি নিয়ে ভোটারদের মন জয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

প্রধান দুই দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিগত নির্বাচনের চিত্র আর এবারের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। গতবার আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে ছন্নছাড়া বিএনপি নির্বাচনী মাঠে নামে। এবার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকার দলের প্রস্তুতি রয়েছে সর্বোচ্চ। তবুও নির্বাচনী মাঠে কেউ কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তাই নীতিনির্ধারকরা কৌশল ঠিক করতে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। প্রচারের জন্য সাব-কমিটি গঠন করা হচ্ছে।

আগামী ১০ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর প্রচারে নামতে পারবেন প্রার্থীরা। তার আগ পর্যন্ত ঘরোয়া বৈঠক, কর্মিসভার আয়োজন করেছেন নেতারা। অবশ্য, দক্ষিণে আওয়ামী লীগের মূল চ্যালেঞ্জ ঐক্য ধরে রাখা। বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনকে নির্বাচনী মাঠে নামাতে না পারলেও পুরান ঢাকার ভোটের হিসাবে পিছিয়ে পড়তে পারে দলটি।

জানা গেছে, ইশতেহার তৈরি, মানুষকে আকর্ষণ করার মতো নগর ভাবনা প্রচার, দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করাসহ নানা কাজে সময় পার করছেন প্রার্থীরা। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ দূর করতে ধারাবাহিক বৈঠকও করছেন উভয় দলের শীর্ষনেতারা।

আওয়ামী লীগ সূত্র বলছে, গত তিন মেয়াদে সারাদেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। রাজধানীতেও এর ছোঁয়া লেগেছে। ফ্লাইওভার-মেট্রোরেল, খেলার মাঠ ও পার্কের উন্নয়ন, পদ্মা সেতু, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ নানা উন্নয়ন কাজের ফিরিস্তি তুলে ধরবে জনগণের কাছে। এছাড়া দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বেশকিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স আদায়সহ নানা কাজে। বিশেষ করে দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোয় ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলইডি লাইট, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টারসহ নানা উন্নয়ন কাজ চলছে এসব জায়গায়। ফলে তারা এসব বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রচারে নামবে।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে জোর দেবেন নানা জাতীয় ইস্যুতে। বিশেষ করে ক্যাসিনো, পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমূল্য, আবরার হত্যা, ডাকসু ভিপি নুরের ওপর হামলা, ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চুড়িহাট্টায় আগুনসহ নানা বিষয় তুলে ধরবে ভোটারদের সামনে। বিএনপি সূত্র বলছে, সরকারের বেশকিছু বিতর্কিত কর্মকা-ে মানুষ বিরক্ত। এসব বিষয় সামনে রেখে প্রচার চালালে মানুষ ভোটের মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীদের বিজয়ী করবে।

এ দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দল থেকেই নতুন প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস ও বিএনপির প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের দুই প্রার্থীই আগে মেয়র পদে নির্বাচন করেছেন। তবে ভোটের মাঠে দুজনেরই প্রতিপক্ষ নতুন। এর আগে উপনির্বাচনে আতিকুল ইসলামের কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও এবারের নির্বাচনে তাকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের আগে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনিসুল হকের সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে ছিলেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দলটির হেভিওয়েট নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তাপস গত তিন মেয়াদে ঢাকা-১০ আসনের সাংসদ। মনোনয়ন পাওয়ার পর তাপস বলেন, সিটি করপোরেশনের মেয়র চাইলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আনিসুল হকের কাছ থেকেই এমন অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। মেয়র হলে তাঁর দেখানো পথেই হাঁটতে চান। ইতোমধ্যে তিনি ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন।

অপরদিকে তাপসের প্রতিদ্বন্দ্বী ইশরাক হোসেন রাজনীতির মাঠে অনেকটাই নতুন। তবে তিনিও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। বাবা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র। ছিলেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি, বিএনপি সরকারের মন্ত্রীও। ফলে বাবার সূত্রে তিনিও ঢাকাজুড়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সাপোর্ট পাবেন।

বিএনপির পক্ষ থেকে মেয়র নির্বাচনের সবুজ সংকেত ছিল ইশরাক হোসেনের কাছে। সেই আলোকেই তিনি ঢাকা দক্ষিণের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। এ বিষয়ে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মাঠে ছিলাম। নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করেছি। নির্বাচন নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। কিন্তু অতীত নির্বাচন বলে এ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তবে আমি মাঠ ছাড়ছি না। শেষ পর্যন্ত মাঠে আছি। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণকে নিয়ে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। আশা করছি জয়ী হলে রাজধানীকে নতুনভাবে সাজাতে পারব।

এ দিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের প্রার্থীরই এর আগে ঢাকা উত্তরে মেয়র নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে তারা উভয়ের মুখোমুখি হননি কখনো। ২০১৫ সালের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তাবিথ আউয়াল। যদিও নির্বাচনের দিন দুপুরে তিনি সরে দাঁড়ান নির্বাচন থেকে। অন্যদিকে আনিসুল হকের মৃত্যুর পর চলতি বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে অংশ নেন আতিকুল ইসলাম। সে নির্বাচনে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। বিএনপি সে নির্বাচন বর্জন করে। এতে সহজেই জয়লাভ করেন আতিকুল ইসলাম।

আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন লাভের পর আতিকুল ইসলাম বলেন, গত এক বছরে একদিনও সময় অপচয় করিনি। সবসময়ই মাঠে ছিলাম। নগরীর উন্নয়নের জন্য দিনরাত কাজ করেছি। আশা করছি জনগণই এর মূল্যায়ন করবে।

আতিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, গতকাল আতিকুল মেয়র পদ থেকে পদত্যাগসহ, সিটি করপোরেশনের নানা অফিসিয়াল কাজ শেষ করেছেন। এর পর থেকে বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কার্যালয় স্থাপন ও গণসংযোগের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করবেন। আজ থেকে নির্বাচনী কর্মকৌশল ও ইশতেহারের বিষয়ে কাজ করবেন।

অন্যদিকে এর আগে ২০১৫ সালের নির্বাচনে দুপুরের দিকে নির্বাচন বর্জন করলেও এবার নির্বাচন কোনোভাবেই বর্জন করবেন না বলে জানা গেছে। নির্বাচন শেষ পর্যন্ত দেখতে চান। এরপরেও কোনো কারচুপি হলে আইনি পদক্ষেপও নেবেন।

তাবিথ আউয়াল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। এছাড়া তাবিথের পিতা দেশের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা।

তাবিথ আউয়াল বলেন, নির্বাচন থেকে বিএনপি যেন সরে যায়, এ জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন নানা অপতৎপরতা চালাবে। কিন্তু এবার নির্বাচন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত থাকব। তিনি বলেন, নেতাকর্মীরাও মাঠে থাকবে। যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয় তবে অবশ্যই বিজয়ী হব। তবে ইতিহাস বলে এ নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে না।

এ দিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে দুজনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছে জাতীয় পার্টি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) কামরুল ইসলাম এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলনকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এর মধ্যে উত্তরের প্রার্থী কামরুল জাতীয় পার্টিতে নবাগত, তবে দক্ষিণের প্রার্থী মিলন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, আমরা বিজয়ের জন্যই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠে থাকব।

এর বাইরে মেয়র নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) আরও কয়েকটি ছোট ছোট দলের প্রার্থী রয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে