আইওটি ব্যবহার করে গরুর খামারকে করা যায় স্মার্ট ফার্ম

0
102

হীরেন পণ্ডিত

হীরেন পণ্ডিত :: আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস’ হলো ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিভিন্ন রকম ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করার নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইলেকট্রনিকস সামগ্রী যেমন—লাইট, ফ্যান, এসি, গিজার, ফ্রিজ, হিটার, পানির ট্যাংক প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ জন্য স্মার্টফোন এবং ইলেকট্রনিকস সামগ্রী উভয়কেই ইন্টারনেট সংযোগের আওতাভুক্ত থাকতে হয়। এতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে অবস্থান করে নিজের স্মার্টফোনের সঙ্গে যুক্ত ইলেকট্রনিকস যন্ত্র সচল আছে কি না দেখা যায়, পাশাপাশি এসব যন্ত্র চালু এবং বন্ধ করা যায়। ফ্যান বা এসিও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এখন আমাদের দেশে গতানুগতিক গরুর খামারের ভাবনা থেকে বের হয়ে কেউ কেউ এখন ‘স্মার্ট ফার্ম বা গরুর খামারকে স্মার্ট করার দিকে ঝুঁকছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই খামারগুলো পরিচালনা করা হয় ‘আইওটি’ বা ‘ইন্টারনেট অব থিংস’-এর মাধ্যমে। বিশ্বে এই সেবা বহুল প্রচলিত হলেও বাংলাদেশে অনেকটা নতুন এই সেবাটি নিয়ে হাজির হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

সাম্প্রতিক সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে খামারিদের মধ্যে নতুন আগ্রহ দেখা দিচ্ছে। উন্নত দেশগুলো কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির সংযোজন করছে। বাংলাদেশেও এ স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। দেশে দুগ্ধ খামার ও প্রাণিসম্পদের খামারে এখন আইওটির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ডিজিটাল ও স্মার্টপ্রযুক্তি ব্যবহারে বেশ সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি উৎসাহিত ও আশাবাদী উদ্যোক্তারা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় ডাচ্ ডেইরি লিমিটেড সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সংযুক্ত একটি স্মার্ট দুগ্ধ খামার। যেখানে ডিজিটাল ও স্মার্ট প্রযুক্তিগুলো সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধারণা করা যায়, কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের দেশ দুগ্ধ ও মাংসের খাত প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার শুরু হবে। এতে দুধ কিংবা মাংসের পুরোপুরি শুদ্ধতা যেমন নিশ্চিত করা যাবে, পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়বে।

বিশ্বের বেশ কিছু দেশ এখন কৃষিকাজে প্রযুক্তির ব্যবহারে একধরনের বিপ্লব এনেছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও কৃষিতে এখনো বলার মতো কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার চোখে পড়ে না। দুধ ও মাংসের চাহিদা মেটাতে প্রাণিসম্পদ খাতে গত কয়েক বছর অনেক তরুণকে আসতে দেখা গেছে। আধুনিক ধ্যান-ধারণায় এসব খামারি নিজেদের খামারে নিয়ে এসেছেন প্রযুক্তির ছোঁয়া। বাংলাদেশে ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহার করে গরুর খামার গড়ে উঠেছে। প্রথমবারের মতো এই সর্বাধুনিক প্রযুক্তিটি ব্যবহার শুরু হয়েছে। খামারের যাবতীয় তথ্য এখন মোবাইল ফোনেই  পাওয়া যাচ্ছে।

খামারের গরু স্মার্ট গরুতে পরিণত করতে একটি সেন্সর ব্যবহার করা হয়। মূলত এই আইওটি প্রযুক্তিতে একটি বায়োসেন্সর গবাদি প্রাণীর পাকস্থলীতে স্থাপন করা হয়। এই বায়োসেন্সরকে বলা হচ্ছে ‘বোলাস’, যা প্রাণির পাকস্থলী থেকে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় তথ্য তৈরি করবে এবং ক্লাউড তথ্যভাণ্ডারে পাঠাবে। এর জন্য অবশ্য খামারে ইন্টারনেট ব্যবস্থা থাকতে হবে। আর সফটওয়্যারের মাধ্যমে গবাদি পশুর দরকারি ও হালনাগাদ তথ্য খামারির মোবাইলে বা কম্পিউটারে চলে যাবে।

বোলাস এবং আনুষঙ্গিক প্রযুক্তি অস্ট্রিয়ার স্ম্যাক্সটেক কম্পানির কাছ থেকে আনা হয়েছে। এই প্রযুক্তির কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। স্ম্যাক্সটেক বোলাস গবাদি প্রাণীর পাকস্থলীতে অন্তত পাঁচ বছর কার্যকর থাকবে।

নতুন এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইলেই পাওয়া যাবে গরুর রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগাম তথ্য, জাত নির্ণয় ও উন্নয়নসংক্রান্ত তথ্য। সেন্সর বা বোলাস থেকে যে ফ্রিকোয়েন্সি আসে তা থেকে গরুর ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ, হিট নির্ণয় বা গর্ভবতী হওয়ার জন্য সঠিক সময় সম্পর্কে আগাম খবর, গর্ভধারণ অবস্থা, গরুর প্রসবের সম্ভাব্য সময় নির্ণয়, গরুর গতিবিধি, তাপমাত্রা, খাবার ও পানির পরিমাণ এবং গরুর প্রাথমিক চিকিৎসার নির্দেশনা পাওয়া সম্ভব।

গরু আইওটি ডিভাইসের আওতায় আনার জন্য প্রথমে একটু বেশিই খরচ পড়ছে । এ জন্য গরুপ্রতি বোলাসের জন্য এককালীন ১০০০ টাকা এবং প্রতি মাসে একটা  টাকা করে খরচ হয় ৫০০ টাকা। সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো থেকে জানানো হয়েছে এটি আসলে একটি চলমান ব্যবস্থা। একটি বোলাস কেউ কিনে নিয়ে গেল আর সেটা দিয়ে সব কিছু হয়ে যাবে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়।

যে বোলাস গরুর পাকস্থলীতে স্থাপন থেকে শুরু করে সেটির তথ্যের জন্য এসএমএস, কল সেন্টার সেবাসহ নানা সেবাও প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে থাকে। তাই সবকিছু বিবেচনা করলে এর করচ খুব বেশি নয়।

খামারিরা খালি চোখে বেশি খরচ মনে করলেও যখন একটি গাভি হিটে আসে এবং সেটা যদি সঠিক সময়ে কৃত্রিম প্রজনন (আর্টিফিশিয়াল ইনসিমিনেশন) না দেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য আরো মাসখানেক অপেক্ষা করতে হয়। তখন তাঁর খাবারের পেছনে যে ব্যয় হয় সেটা হিসাব করলে আসলে এই সেবার বার্ষিক খরচ হয়ে যায়। প্রথম দিকে অল্প পরিমাণে সেবা দেওয়ার ফলে খরচ একটু বেশিই হচ্ছে। আর ডিভাইসগুলো যেহেতু আমদানিনির্ভর তাই এমনটি হয়। তবে এই সেবার গ্রহীতা বাড়তে শুরু করলে এর খরচ অনেক কমে আসবে বলে অনেকে মনে করেন।

প্রাণিদের জন্য প্রদানকারী সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো আইওটি ডিভাইস ও সেবা প্রদানের পাশাপাশি গবাদি পশুকে বীমার আওতায় আনা যাবে। গবাদি পশুর বীমা অঙ্ক ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা েপর্যন্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। দুগ্ধবতী গাভি, দুধেল মহিষ, মাদি বাছুর, বকনা বাছুর, প্রজনন ষাঁড় ইত্যাদি বীমার আওতায় আনা যায়। খামারের প্রতিটি পশুকে আলাদাভাবে বীমা করতে হয়। এই বীমা সুবিধা দেবে  প্রাণিসেবার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান বা কিছু ইনস্যুরেন্স কোম্পানী। প্রতিটি পশুর মৃত্যুজনিত বার্ষিক প্রিমিয়াম বীমা করা টাকার হার সাড়ে ৪ শতাংশ, চুরি হলে কিংবা হারিয়ে গেলে বার্ষিক প্রিমিয়াম আড়াই শতাংশ। কোনো পশু অসুস্থ হলে কিংবা আহত হয়ে পঙ্গু হলে তার পুরো চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করবে বীমা প্রতিষ্ঠান। তবে সেন্সর থাকা অবস্থায় কোনো গরু মারা গেলে তার জন্য পুরো টাকা পরিশোধ করবে প্রতিষ্ঠানগুলো।

আইওটি ডিভাইস হিসেবে প্রতিটি বোলাসের আয়ুষ্কাল ধরা হয় পাঁচ বছর। এরপর সেটি কার্যক্ষমতা হারাবে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অনেকসময় খামারিদের কাছ থেকে বোলাস ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থাও রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলোর। বোলাস ফেরত দিলে তার জন্য কিছু টাকাও ফেরত পাবেন খামারিরা।

দেশে এখন গরুর খামারির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। যেহেতু আইওটি প্রযুক্তিটি দেশে একেবারেই নতুন, তাই এতে আগ্রহী করে তুললে কিছুটা সময় লাগছে । ধীরে হলেও খামারিদের ইতিবাচক দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যাতে করে ব্যবসাকে উদ্যোক্তারা লাভজনক করে তুলতে পারেন। সেদিকটি মাথায় রেখেই খামারিদের কাছে যাচ্ছে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান। আইওটি ব্যবহার করে কি সুবিধা পাওয়া যায় এবং এর ব্যবহার থেকে পাওয়া সুবিধাগুলো জানতে পারছে এবং তাতে অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

দেশে সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তিটি এরই মধ্যে ব্যবহার শুরু করেছে কয়েকটি খামার। প্রথম হিসেবে এটি ব্যবহার করেছেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের  একটি খামার ‘সেঞ্চুরি ডেইরি’। দুগ্ধ উৎপাদনমুখী ওই খামারে প্রযুক্তি সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয়েছে। আইওটি থেকে অনেক ধরনের সুবিধার কথাও জানানো হয়েছে এই ফার্ম থেকে। খামারীরা বিশেষ করে গরুর স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁরা অনেক চিন্তা মুক্ত হয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো বেশ কয়েকটি খামারে আইওটি এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ, তাই আমাদের স্বপ্নটাও আধুনিক কৃষকদের নিয়ে। অনেক তরুণ এখন বেছে নিচ্ছেন এমন খামার করার মতো উদ্যোগ। তাঁদের মাধ্যমে এটিকে আরো বড় আকারে পৌঁছে দিতে হবে সারাদেশে।

দেশের সব প্রান্তেই এই সেবাটি ছড়িয়ে পড়ুক সেটাই সবার প্রত্যাশা। যদিও আইওটির অনেক ডিভাইস এখনো আমদানী নির্ভর, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান যদি মান সম্পন্ন ডিভাইস তৈরি করতে পারে তাহলে সবাই এটা স্বল্পমূল্যে সরবরাহ করতে পারবে এবং খামারীরা ব্যবহার করতে পারবে।

লেখক: রিসার্চ ফেলো, ইন্টারনেট অফ থিংস, বিএনএনআরসি

 

 

Print Friendly, PDF & Email

Source link