অপুর মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গণযোগাযোগ বিভাগ, রেখে গেল প্রশ্নও

150


ঢাবি করেসপন্ডেন্ট

রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকার বাসা থেকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে মাসুদ আল মাহাদী অপুর মরদেহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় শোক নেমে এসেছে বিভাগটিতে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে শোকবার্তা। বিভাগের শিক্ষকসহ অপুর সহপাঠী-অগ্রজ-অনুজরাও ফেসবুকে তাকে স্মরণ করে বলছেন, এই প্রয়াণ তারা মেনে নিতে পারছেন না।

সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো শোকবার্তায় বিভাগটির চেয়ারপারসন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহাম্মদ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মাসুদ আল মাহাদী অপুর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে বিভাগের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী গভীর শোক প্রকাশ করছে।’

অপুর অকালমৃত্যুতে বিভাগজুড়েই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অপুর সঙ্গে তোলার একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘মাহাদী অপু আত্মহত্যা করেছে আজ। কলা ভবনে বিদ্যুৎ ছিল না বলে ২০১৬ সালে একদিন গাছতলায় বসেছিলাম। অপু তখন অনার্স শেষ বর্ষে। আমার সঙ্গে গবেষণা প্রস্তাব লিখেছে। ‌উজ্জ্বল মনস্কদের একজন। কখন এত অন্ধকার হয়ে উঠেছিল ওর চারদিক! জানলে আবার  হয়তো গাছতলাতেই বসতাম!

এই ঢাবি অধ্যাপক আরও লিখেছেন, ‘গোছানো ভবিষ্যৎপন্থিদের একজন সে ছিল না। জীবন তার জন্য খুব  সহজ হওয়ার কথা না। কিন্তু আত্মহত্যা!’

আরও পড়ুন- চাঁনখারপুলে ঢাবি শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী তারেক হাসান নির্ঝর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আহারে অপু ভাই! আমাদের এত স্মৃতি রেখে চলে গেলেন! আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে মেধাবী মানুষগুলোর একজন অপু ভাই। মাসুদ আল মাহাদী অপু। আমাদের আত্মার আত্মীয়। আমার ডিপার্টমেন্টের বড় ভাই। সূর্যসেন হলে থাকতেন। আজ দুপুরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সবাই উনার জন্য দোয়া করবেন।’

এমন সব মন খারাপ করা স্মৃতিচারণের মধ্যেও অপুর মতো তরুণদের এই পরিণতিতে ‘সিস্টেমে’র দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এই বিভাগের শিক্ষক ফাহমিদুল হক। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, মাসুদ আল মাহাদী (অপু) মেধাবী ছাত্র ছিল। সত্যিকারের মেধাবী। ফলাফলও ভালো করত। তবে গতানুগতিক ভালো ফলাফল করাদের মতো সে ক্লাসে খুব নিয়মিত ছিল না। সে প্রশ্ন করত, প্রতিবাদ করত। ষাটের দশক কিংবা নিদেনপক্ষে আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শিক্ষার্থী নিয়ে গর্ব করত, যাদের কারণে ছাত্র আন্দোলন একটি স্বর্ণালী এক রোমান্টিসিজম এখন, অপু ছিল সে ধরনের শিক্ষার্থী। অনার্সে সে থার্ড হয়েছিল। অনার্সের রেজাল্টের পর একদিন অপুকে বললাম, মাস্টার্সের এক বছর বাড়তি একটু মনোযোগ দিলেই তুমি প্রথম হতে পারবে। সে বলল, আমি তো প্রথমই হতাম অনার্সে। হিসাব করে দেখেছি, একজন মাত্র শিক্ষক সেই প্রথম বর্ষ থেকে যে পরিমাণ কম নম্বর দিয়ে আসছেন, ওনার কোর্সে এভারেজ নম্বর পেলেই প্রথম হতাম।’

অপুর আত্মহত্যার পেছনে সিস্টেমের দায় নিয়ে অধ্যাপক ফাহিমদুল আরও লিখেছেন, ‘অপু আত্মহত্যা করেছে শুনছি। সিস্টেম কীভাবে প্রখর এক তরুণকে এদিকে ঠেলে দিতে পারে, তার একটিমাত্র উদাহরণ দিলাম। যেসব শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করত, প্রশ্ন করত ওই শিক্ষক সাধারণত তাদের অপছন্দ করেন এবং বেছে বেছে ভিক্টিমাইজ করেন। তিনি আবার সব ধরনের ভিসির প্রিয়পাত্র থাকেন। ফলে তিনি এসব করে পারও পেয়ে যান। আমি প্রসঙ্গটি একবার বিভাগে শিক্ষকদের মধ্যে তুলেছিলাম। ওই শিক্ষক বললেন, এখানে আদর্শের ভিত্তিতে কোনো কোনো স্টুডেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে! অবশ্য বিভাগের সেই সামর্থ্য বা ইচ্ছে কোনোটাই তেমন ছিল না যে একজন শিক্ষক একজন শিক্ষার্থীকে কীভাবে টার্গেট করে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার তদন্ত করবে বা ব্যবস্থা নেবে। আমাদের সিস্টেম অপুদের হতাশ হতে বাধ্য করে। সেই সিস্টেম, সেই শিক্ষককে আরও বেশি ক্ষমতাবান করেছে পরে।’

অপুকে নিয়ে শিক্ষক, সহপাঠী, অগ্রজ-অনুজদের এমন আরও সব স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকজুড়ে। অপুর সহপাঠী ও বন্ধুরা জানাচ্ছেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে বরাবরই নেতৃত্বে থাকতেন অপু। ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে যেমন তিনি সরব ছিলেন, তেমনি সব ধরনের নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনেও সামনের সারিতেই থাকতেন তিনি। এক বাক্যে সবাই বলছেন, তারুণ্যে উদ্ভাসিত এরকম একজনের এই অকালপ্রয়াণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়।

পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠি গ্রামে জন্ম নেওয়া মাসুদ আল মাহাদী অপু সাংবাদিকতা বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মাহাদী ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেছেন।

অপু শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই দৈনিক ইত্তেফাকে ক্রীড়া বিভাগে সাংবাদিকতা করেছেন। ৪১-তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আরও বেশকিছু চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার বন্ধু-সহপাঠীরা।

সারাবাংলা/আরআইআর/টিআর





Source link