অনেক চ্যালেঞ্জ, সহিংসতা বাধা পার করে নারীরা এখন ভালো অবস্থানে: পারভীন মাহমুদ

0
65

পারভীন মাহমুদ এফসিএ

মা’কে দেখেই মানবিক কাজে অনুপ্রাণিত হওয়া। অনেক পরিচয়ের মধ্যে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় আজ তিনি একজন সফল নারী। মানুষের উন্নয়নে কাজ করার প্রতি দুর্বলতা থেকেই হাজারো নারীর আদর্শ, অনুপ্রেরণা তিনি৷ মানবিকতার সুখ- অর্থের বিনিময়ে তৈরি হয় না । ক্ষুদ্র ও মাঝারী ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বেসরকারি উন্নয়ন সেক্টরে তিনি একজন প্রথিকৃৎ। তিনি আপন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত নন, তিনি নিজে একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট হয়ে মেয়েকেও বানিয়েছেন একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। তারাই বাংলাদেশের প্রথম মা-মেয়ে চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। কথা বলছি পারভীন মাহমুদ সম্পর্কে।

পারভীন মাহমুদ, ইউসেপ- বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। ব্র্যাকের সাথে তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, এবং গ্রামীণ টেলিকম ট্রাষ্টের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অফ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অফ বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং দক্ষিণ এশিয়ান ফেডারেশন অফ অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সাফা) এর প্রথম নারী বোর্ডের সদস্য এবং প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট ছিলেন শীর্ষস্থানীয় অ্যাকাউন্টিং পেশাদার সার্কের বডি তিনি সিএ মহিলা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ছিলেন- আইসিএবি-র নেতৃত্ব কমিটি উইমেন ইন উইথ ইন চেয়ারপারসন এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাফার নেতৃত্বে কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।

তিনি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল, পিকেএসএফ, আরডিআরএস, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এর বোর্ড মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড এবং বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বতন্ত্র পরিচালক। তিনি শাশা ডেনিমস লিমিটেড, মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্ভিসেস (এমআইডিএএস), অ্যাসিড সার্ভাইভার্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ছিলেন।

তিনি শামসুন্নাহার রহমান পরাণ প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ঘাসফুল-এর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও লায়ন্স ক্লাব অফ চট্টগ্রাম পারিজাত এলিট এর প্রেসিডেন্ট।  পারভীন মাহমুদের স্বামী রাজনীতিবিদ ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, তাদের এক ছেলে, এক মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে পারভীন মাহমুদের জীবনের অভিজ্ঞতার নানা দিক নিয়ে ইউনাইটেড নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম এর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রতিবেদক নিফাত সুলতানা মৃধা

 

ইউনাইটেড নিউজ: আমরা প্রতিবছর নারী দিবস পালন করি। তবুও নারীরা সংগ্রাম করে জীবন কাটাচ্ছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটছে না, এর জন্য করনীয় কি?


পারভীন মাহমুদ: নারীর জন্য প্রতিদিনই নারী দিবস হওয়া প্রয়োজন শুধু একদিন না। আমরা অনেক দূর এগিয়েছি । আমাদের অনেক অর্জন আছে। অনেক চ্যালেঞ্জ, সহিংসতা বাধা পার করে নারীরা এখন ভালো ভালো অবস্থানে রয়েছে। সবকিছুর ভালো খারাপ দুটি দিক রয়েছে। সময় লাগবে কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের দেশ নারী নেতৃত্ব, আমি খুব গর্ববোধ করি এত সমালোচনা, এতো সমস্যার পরও সার্বিক ভাবে নারী নেতৃত্ব যেভাবে এগিয়ে নিচ্ছে তা প্রশংসনীয় । আমরা এখন নারীকে অনেক ভালো ভালো অবস্থানে দেখতে পাচ্ছি। তবে নারীদের জীবন মানেই সংগ্রাম। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সহিংসতা, নির্যাতন কমাতে সমাজ পরিবর্তন, দৃষ্টি পরিবর্তন করতে হবে, সবকিছু মিলিয়ে মেয়েদের প্রতি যে পারিবারিক সম্মান, বন্ধন তৈরি করতে হবে। সহায়ক ভূমিকা পরিবারের ভেতর থেকে শিক্ষা আসতে হবে। শিথিল সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মেয়েকে সম্মান দেখিয়ে তার সাহসিকতাকে এগিয়ে চলার মানসিকতা তৈরি করা পরিবার থেকেই আসতে হবে। হোক বাবা, মা, স্বামী, শ্বাশুড়ি কিংবা কোনো আদর্শ।

ইউনাইটেড নিউজ: এবার নারী দিবসে বাংলাদেশের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘করোনা কালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ এই বিষয়ে মূল্যায়ন করবেন?

পারভীন মাহমুদ: এটি আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে কেননা এমনি মেয়েরা বৈষম্যের শিকার । তাছাড়া বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতিতে মেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে, বিয়ে হয়ে গেছে, বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে, চাকরি হারিয়েছে । তবুও নারীরা পিছিয়ে নেই, হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। আমরা নিজেরাও মনে করেছিলাম দেশে দুর্যোগ নেমে আসবে। সেখানে অনলাইনে অনেক এগিয়ে গেছে মেয়েরা, প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলছে। একজন মেয়ে থেকে সফল নারী হতে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। একজন পুরুষ হিসেবে তার মন মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রতিটা স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি, মেয়ের প্রতি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। আমাদের ঘরে ঘরে এমন পুরুষ মন তৈরি করতে হবে। সাহায্য করে উৎসাহ দিতে হবে। সর্বোপরি মেয়েও আরেকজন মেয়েকে সাহায্য করতে পারে। একজন নারীকে আরেকজন নারীর দায়িত্ব নিতে হবে। নেতৃত্ব দিয়ে তৈরি করতে হবে। তাহলে একটি জাতি, সমাজ, দেশ ও নতুন বিশ্ব গড়ে উঠবে।

ইউনাইটেড নিউজ: করোনায় কর্মসংস্থান হারিয়েছে অনেক নারী, কিংবা পরিবারের পুরুষ সদস্যকে হারিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পড়েছে তাদের উপরে। এই সময়টুকুতে নারীর জন্য কি পরামর্শ থাকবে?

পারভীন মাহমুদ: এটা খুবই দুঃখজনক। পরিবারগুলো মানসিক ভাবেও জর্জরিত। করোনা পরিস্থিতি সবার জন্য একটা সংগ্রাম, আবার শিক্ষাও দিয়েছে। মেয়েরা অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হলে যে কোনো ঝড় আসলেও মেয়েরা সামাল দিতে পারে। করোনায় নারী শ্রমিকরা কাজ হারিয়েছে, প্রায় সর্বস্তরের মেয়েরা এর ভোগান্তিতে পড়েছে। বিউটি পার্লার, দর্জি সবক্ষেত্রে তাদের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে করোনা কিন্তু জীবনে একটা শিক্ষা দিয়েছে। যাদের টাকা সংরক্ষণ রাখার অভ্যাস ছিলও তারা ধকলটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। তারপর অনেক মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে জীবনে টাকা সংরক্ষণ করার অভ্যাস গড়তে হবে। আগে সমাজ ব্যবস্থা একজনের উপর দায়িত্ব ছিলও। তখন পরিবারে সহযোগিতা ছিলও শেয়ার ব্যাপার ছিলও। আমার তোমার বলে ভাগ হতো না। এখন ভোগ বিলাসিতা বেড়েছে আমার বলে একটা কথা তৈরি হয়েছে। সবাই আলাদা হয়ে গেছে। যারা খুব সংরক্ষণ করে তারাই ভালো আছে, ভালো থাকে। আমাদের ইনকাম হলে আমরা জীবন পরিবর্তন করতে উঠেপড়ি। আমি মনে করি সেটা হওয়া উচিত না। যারা সংরক্ষণ করে তাদের কিন্তু একটা অভ্যাস হয়ে যায়। সেভিংসটা জীবনের একটা অংশ হয়ে যায়।

ইউনাইটেড নিউজ: নারী হিসেবে সফল হতে আমরা আমদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন কিভাবে পরিচালনা করবো? এর জন্য সবচেয়ে বেশি কি প্রয়োজন মনে করেন?

পারভীন মাহমুদ: জীবনটাকে আত্মবিশ্বাস দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে সফল করে তোলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে । দিক বাছাই করতে হবে কোনটি করলে আমি সফল হতে পারবো তা খুঁজতে হবে । একটি গাইডলাইন বা আদর্শ রাখতে হবে। স্বপ্ন দেখতে হবে । আমার তো এখন মনে পড়ে বেগম রোকেয়ার ওই স্বপ্নটা, আমি যখন আকাশে উড়বো তখন আমার পাশে একজন মহিলা পাইলট থাকবে । সাদাকালো জীবনে আমাদের মতো রঙিন চিন্তা ছিলও না তবুও তিনি স্বপ্ন দেখছেন যা এখন বাস্তবায়ন হয়েছে। আমাদের দেশে মহিলা পাইলট আছে। এখন এসব স্বপ্ন আমার নিজেরই দেখছি বাস্তবায়ন হচ্ছে। বর্তমানে নারীদের সফল হতে অনেক মাধ্যম তৈরি হয়েছে। অনলাইন, কৃষি, লাইভ যেমন মোটামুটি সফলতার ভালো লাইন হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে বাজারের সাথে লিঙ্ক হতে হবে । আমার একটা উপলব্ধি হচ্ছে প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এসব কাজে লাগাতে হবে।

ইউনাইটেড নিউজ: মেয়েদের জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যা বাস্তবিক ভাবেই খুব কঠিন। এগুলো কাটিয়ে উঠতে নারীকে কি করতে হবে ?

পারভীন মাহমুদ: মানুষ প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে গেছে এর পজিটিভ নেগেটিভ ভাবনা চলে এসেছে। মেয়েরা ভুল পদক্ষেপ নিচ্ছে। আবার এটাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে সাবলম্বী করছে। নিজের পরিচয় করতে হলে সবকিছুর ভারসাম্য রাখতে হবে । জীবনে কাউকে আদর্শ মানতে হবে। সংসার সুখের জন্য, পরিবারের জন্য যেমন সেক্রিফাইস করতে হয়, সব কিছু শেয়ার করে ছেলেমেয়ে দুজনকে সহযোগিতা রেখে চলতে হবে। নিজেকে শক্ত করে এগিয়ে যেতে হবে।

ইউনাইটেড নিউজ: এনজিও সেক্টর গুলো তৃণমূল নারীদের উন্নয়নে কাজ করছে, আবার এ সেক্টরে অনেক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে, এ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?

পারভীন মাহমুদ: এনজিওরা সরকারের পরিপূরক বা সরকারের পাশে থেকে বাংলাদেশের জন্য খুব বড় ভূমিকা পালন করছে। তৃণমূলে এনজিওরা যেভাবে পৌঁছাতে পারে বিশেষ করে স্থানীয়রা তা সত্যিই অসাধারণ। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় এনজিওরা সবকিছু বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়েও কাজ করে। তাদের যে এজেন্টগুলো থাকে তারাও খুব ভালো কাজ করে, গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যে এখন সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। এনজিওগুলো নানা ধরনের ঋণ দিয়ে সহায়তা করছে।

ইনস্যুরেন্স বা বীমা করে রাখা প্রতিটা মানুষের উচিত ৷ আমাদের সাধারণ জীবনে যেন ব্যবহারিক ভাবে সবাই ইনস্যুরেন্স করে রাখে। এটি খুব উপকার দিবে জীবনে৷ আমাদের দেশে ইনস্যুরেন্স সিস্টেমটি নেই, আমি খুব খুশি হব যদি আমার আয় অনুযায়ী, আমার সাধ্য অনুযায়ী বিমা প্রকল্প প্রবর্তন করা হয়। এটা যেন রাষ্ট্র সরকার থেকে আসে। আমাদের ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এটা আছে তবে পুরোপুরি ভাবে নেই। আমি খুব চেষ্টা করি আমাদের ক্ষুদ্র ঋণের আওতায় এই প্রকল্পটা বাস্তবায়ন করতে।

ইউনাইটেড নিউজ: নারীরা উদ্যোক্তা হচ্ছে কিন্তু এটা অনেকটা চ্যালেঞ্জিং, সরকার এ বিষয়ে কতটা তাদেরকে সহায়তা করছে বা কি করতে পারে?

পারভীন মাহমুদ: সরকারের পলিসি খুব ভাল। সরকার সব সময় নারীদের সাহায্যের জন্যই কাজ করে। এনজিও সেক্টর গুলো এক ভাবে সাহায্য করছে, তাছাড়া সরকারের ব্যাংক ঋণতো রয়েছে, তবে তা ঠিকভাবে পরিচালনা করা, সঠিক মানুষ বাছাই করার দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Source link