breaking news New

হৃদয়ে কষ্ট নিয়ে ওপারে চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা সাধন কুমার, পেলেন না রাষ্ট্রীয় মর্যাদা

রাজিব শর্মা(চট্টগ্রাম অফিস):
শোকাবহ আগষ্ট মাসের প্রথম দিনেই অনেক দুঃখ কষ্ট আর অবহেলা বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে নিরবেই পরপারে চলে গেলেন বাংলার রনাঙ্গনের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন কুমার গোস্বামী।

প্রিয় পাঠক আমাদের পেজে লাইক দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন
স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী হলেও জীবনযুদ্ধের পরাজিত সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাধন কুমার অযত্নে অবহেলা আর বিনা চিকিৎসায় ছোট্ট ঝুপরি ঘরেই তার অবহেলিত জীবনের শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। হয়তো অনেক অভিমান আর কষ্ট ভরা মন নিয়ে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে পরপারে চলে গেলেন তিনি। হয়তো সাধন কুমারের মত এমন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা অবহেলায় পরে আছে আমাদের দেশের কোন না কোন এক স্থানে। আর যেন কোন সাধন কে এভাবে অবহেলায় থাকতে না হয়। এমন টাই প্রত্যাশা স্বাধীন রাষ্ট্রের কাছে।

০১ আগষ্ট বৃহস্পতিবার কোন এক সময় এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ময়লা আবর্জনায় ভরে থাকা জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরেই পরে ছিলেন রাষ্ট্রের এই সুর্যসন্তান।

এই বীর যোদ্ধা যে কখন যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন এই খবরও কেউ রাখেনি। এই মানুষটির সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মানবিক রাজবাড়ী হাজির হয় খানগঞ্জ ইউনিয়নের বেলগাজি পুরাতন বাজার এলাকায়।

এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে আনার জন্য তার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেই স্থানীয় লোকজন সহ তাকে ডাকা ডাকি করলে তার কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। স্থানীয়রা বলেন তিনি আর নেই হয়তো। তবুও যেন মন মানে না তাকে উদ্ধার করে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরী বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষনা করেন।

পরে ০২ আগস্ট রাজবাড়ী পুজাঁ উদযাপন কমিটির সহ সভাপতি গনেশ মিত্র, খানগঞ্জ ইউয়িনের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় পৌর মহাশ্মসানে তার শেষ কৃর্ত সৎকার করা হয়।

১৯৭১ সালে দেশকে পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ভারতের কল্যাণী ক্যাম্পে ট্রেনিং শেষে দেশে এসে যুদ্ধ করে শত্রুদের পরাজিত করেন।

আর এই মহান মুক্তিযোদ্ধার স্থান হয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের বেলগাছী পুরাতন বাজার এলাকার ২শত বছরের পুরনো মন্দিরের পিছনের একটি ঝুপরি ছাপড়া ঘরেই পরে ছিলেন। যার মধ্যেই তার জীবন ছিল সীমাবদ্ধ। সেই ঘরে কোন আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না থাকার জন্য কোন ভালো বিছানা। উপরে টিন আর নীচে মাটি। এই মাটিই তার বিছানা। ঝড়-বৃষ্টি হলেই কাঁদা হয়ে যেত তার এই মাটির বিছানা। তার শরীর শুকিয়ে জীর্ণশীর্ণ ছিল।

ভাঙ্গাচোড়া ঝুপরি ঘরের মেঝেতে এভাবেই ধুকে ধুকে জীবনের শেষ সময় পার করেছেন দেশের এই সূর্য সন্তান। যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করতে ভূমিকা রেখেছেন, সেই বীর সন্তানকে আমরা দিয়েছি একটি ঝুপরি ঘর-যেখানে কোন আলো-বাতাস ঢুকতে পারতো না। মরণেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়, কবর আর চিতাতেই শেষ আশ্রয়। আজ সেটাই হলো এই বীর মুক্তিযোদ্ধার। এই মৃত্যুতেই যেন তার জীবনের সকল সমস্যার সমাধান হলো।

তবে সাধন কুমার চক্রবর্তীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন সনদ ছিল না। সেকারনেই তাকে দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রীয় ভাবে কোন সম্মান।

স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি রাজবাড়ীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গিয়ে শত চেষ্টা করেও মুক্তিযোদ্ধার সনদ সংগ্রহ করতে পারেননি। তার শৈশবও ছিল কষ্টে ভরা। বর্তমান কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর গ্রামে ভৈরব কুমার লাহিরীর বাড়ীতে বড় হন তিনি। ১৯৭৬ সালে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি চিরকুমার। মামার পরিবার অন্যত্র চলে যাওয়ায় আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন তিনি। তার ব্যক্তিগত কোন জমি-জমা বা আশ্রয় ছিল না। যার জন্য তিনি দীর্ঘ প্রায় ৩০/৩৫ বছর বিভিন্ন পরিবারে লজিং মাস্টার হিসেবে থাকতেন। নির্লোভ ধর্মনিরপেক্ষ এই লোকটি ছিলেন অহিংস। ঘর বাধা বা স্থায়ী ঠিকানা করতে চাননি কখনও। সকলেই তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতো। বছর তিনেক আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই সময় তিনি থাকতেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রঞ্জু চৌধুরীর কাচারী ঘরে।

বেলগাছীর আরশিনগর বাউল সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আশরাফুল আলম আক্কাস বলেন, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে প্রতিবাদ করায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাবুদের টনক নড়েছিল। সাধন গোস্বামী উচ্চ বর্ণের হিন্দু হওয়ায় তাকে স্থান দেওয়া হয় শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর মন্দিরের আশ্রমে। ডাঃ দিপ্তী রানী সাহা ও জেসি সাহাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য হিন্দুদের তত্তাবধানে তাকে দেখভাল ও সেবা-করার কথা ছিল। কিন্তু আজ শুনছি তার কোন খোঁজই রাখেন না কেউ-ভাবতে অবাক লাগে। এক প্রকার অবহেলার করনেই তিনি এভাবেই মনে কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলেগেলন।

ডাঃ অপূর্ব কান্তি সাহা বলেন, সাধন গোস্বামী একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তিনি কোনদিনই নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে চাননি। ঘর-সংসারও করেননি। জীবন-সংসার কী জিনিস তা কখনো বুঝতে চাননি। তার কোন লোভ-লালসা ছিল না। তিনি সেনা বাহিনীতে চাকরী পেয়েছিলেন। কয়েক বছর পরে চাকরী ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন। পরে আবার বিদ্যুৎ অফিসেও চাকরী করেছেন। সেটাও ছেড়ে দেন। সত্যি বলতে কি তার জীবনের প্রতি কোন মায়া ছিল না। তিনি তার ইচ্ছেমতো চলতেন। ৩/৪ বছর আগে তাকে বেলগাছী রেল স্টেশনে পড়ে থাকতে দেখে আমরা কয়েকজন মিলে তাকে মন্দিরে রাখার ব্যবস্থা করে দেই। গত বছর তিনি আরো বেশী অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা করতেন। সেগুলো পরিষ্কার করার মতো কাউকে পাওয়া যেতনা। তাছাড়া মন্দিরতো পরিষ্কার রাখতে হবে। মন্দিরের পবিত্রতা বিষয়ে বিবেচনা করে সকলের সাথে আলোচনা করে তার থাকার জন্য মন্দিরের পিছনে একটি ছাপড়া ঘর করে দেওয়া হয়। তিনি সেখানেই ছিলনেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অবঃ) অলীক গুপ্ত বীর প্রতীক বলেন, সাধন কুমার চক্রবর্তী একজন মুক্তিযোদ্ধা। ওর কাছে একটি সনদও আছে। ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারী অথবা মার্চ মাসে সেটি দেওয়া হয়েছিল। আমি তখন ফরিদপুর জেলার মিলিশিয়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলাম। যে কারণেই হোক সে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ সালে যখন ফরম দেয়া হলো সে তখন অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। কিন্তু যেদিন কালুখালীতে যাচাই-বাছাই হয়, সেদিন যারা সেখানে ছিল তারা ওর সাথের মুক্তিযোদ্ধা ঢাকায় থাকার কারণে ওকে কেউ চিনতে পারেনি। তাই হয়তো সেখান থেকে ওর নাম বাদ পড়েছে।

আমি রাজবাড়ী-২ আসনের এমপি জিল্লুল হাকিমের সাথেও কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, দাদা আমিও সাধনকে চিনি। আপনি আমার সাথে সাধনকে দেখা করতে বলেন। আমি সাধনকে পরে এমপির সাথে দেখা করতে বলি। কিন্তু এমপি ঢাকায় থাকার থাকার কারণে তার সাথে দেখা করতে পারেনি। যাচাই-বাছাই’র বোর্ডে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং রাজবাড়ী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন। তাদেরকেও আমি বলেছিলাম। কিন্তু তারাও সাধনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আজ সাধননের মত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি। আমি মনে করি সাধন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাই যেন রাষ্ট্রীয় ভাবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আমি চেষ্টা করবো।

মতামত দিন

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register