সাংবাদিকের মাথায় ৫৭ ধারার খড়গ

অনলাইন সাংবাদিকতার দ্রুত প্রসারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে বলে মনে করেন প্রবীণ সাংবাদিকরা। পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের অজপাড়া-গাঁ থেকে শহরাঞ্চলের মানুষের অধিকার ও মুক্ত মতামত প্রকাশেও অনলাইন সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দেশের সংবাদ মাধ্যম হিসেবে ভিজুয়াল মিডিয়াও ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু অনলাইন এবং ভিজুয়াল সংবাদ মাধ্যমের ওপর এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে আবির্ভূত হয়েছে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা।

গত এক বছরে এ আইনে দুটি অনলাইন পত্রিকার শীর্ষ দুই সাংবাদিক জেল খেটেছেন। প্রায় দেড় মাস জেলে খেটেছেন দৈনিক শিক্ষা নামে একটি ছোট পরিসরের অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান। বর্তমানে জেলে আছেন উদীয়মান প্রতিষ্ঠান নতুনসময় ডটকম এর নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজু। এ ছাড়া ৫৭ ধারায় জেল খেটেছেন বাংলামেইলের তিন সাংবাদিক মাকসুদুল হায়দার চৌধুরী, শাহাদাত উল্লাহ খান ও প্রান্ত পলাশ। এ ছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় ৫৭ ধারায় গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন আরো একাধিক সাংবাদিক।

পেশাগত কারণে ৫৭ ধারার মামলায় আরো জেল খেটেছেন বাংলাদেশ প্রতিদিন ও একুশে টেলিভিশনের সাভার প্রতিনিধি নাজমুল হুদা। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে প্রবীণ সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকেও কম কাঠখড় পোহাতে হয়নি।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তন ডটকম টিম সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে দেখেছে দেশের দুর্গম পাহাড় থেকে হাওর, বিদ্যুৎবিহীন গ্রাম থেকে চর কিংবা শহরের মুদি দোকানি রিকশাওয়ালা পর্যন্ত স্মার্ট ফোনে ফেসবুক থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি সংবাদ জানার জন্য টিভি রেডিও থেকে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমকেই গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন।

তাদেরই একজন বান্দরবানের রোয়াইনছড়ির রনিনপাড়ার জেমন্স। রোনিনপাড়ায় বিদ্যুৎ না থাকলেও সৌর বিদ্যুতেই চলে সব। জেমন্স প্রাইমারিও পাস করেননি। কিন্তু বান্দরবান শহর থেকে প্রায় দেড় দিনের হাঁটা দুর্গম পথের দূরত্বে থেকেও অনলাইন পত্রিকায় দেশের হালচালের খোঁজ রাখেন ঠিকই।

জেমন্সের মতো হাওরের দুর্গম গ্রাম নেত্রকোণার মল্লিকপুরের কৃষক ইন্দ্রজিত, সুবেন্দ্র বা মেঘনার মায়াদ্বীপের কিশোর জেলে ওহেদ, পারভেজরা দেশের প্রথম সারির অনলাইন পত্রিকাগুলোর পাঠক।

অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের যখন এ সর্বময় প্রসার সে সময় তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম।

কী আছে সেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়? এতে ইলেকট্রনিক ফর্মে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও এর দণ্ড সম্পর্কে বলা হয়েছে- (এক) ‘কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশংকা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’ (দুই) ‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রভাষ আমিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘আইসিটি আইনের ৫৭ ধারাটি সাংঘর্ষিক। একই কারণে এই ধারায় ভিজুয়াল বা অনলাইন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা গেলেও একই সংবাদ প্রিন্ট মিডিয়ায় ছাপা হলে কেউ এ ধারায় কিছু করতে পারবে না।’

আহমেদ রাজুর উদাহরণ টেনে প্রভাষ আমিন বলেন, ‘যে সংবাদ অনলাইনে প্রকাশের কারণে রাজুকে জেল খাটতে হচ্ছে একই সংবাদ প্রিন্ট পত্রিকায় প্রকাশ করা হলে ওয়ালটন এ ধারায় কিছু করতে পারতো না। যা সাংঘর্ষিক।’

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘এ ধারাটি এমন যে, কোনো রকম সমন ছাড়াই একজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা যায়। আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে একজন অনলাইন সাংবাদিক আহমেদ রাজু এখনও জেলে। আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে এ ৫৭ ধারা বাতিল করতে হবে।’

‘প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে কারো কোনো আপত্তি থাকলে তিনি প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন। কিন্তু মামলা করে সাংবাদিককে জেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়,’ বলেন ফরিদা ইয়াসমিন।

এ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘ইন্টারনেটে মিথ্যা বা অশ্লীল সম্প্রচার করলে অনাধিক ১৪ বছর এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকার অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান করা হয়েছে ৫৭ ধারায়। যা আসলে একটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি মনে করেন, আইন প্রণেতাদের উচিত এ ধারাটি সহজ করা। এটি একটি অ-জামিনযোগ্য ধারা। যা ন্যূনতম জামিনযোগ্য হওয়া উচিত।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক চার হাজার অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে। যদিও মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা থাকছে না। এ ধারার বিষয়ে নতুন ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। সেখানে ৫৭ ধারার বিষয়টি পরিষ্কার করা হবে। মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণের কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই।

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register