সকাল থেকেই আতিয়া মহলে গোলাগুলি-বিস্ফোরণ

সিলেট মহানগরীর শিববাড়ির ‘জঙ্গি আস্তানা’ আতিয়া মহলে চালানো ‘অপারেশন টোয়াইলাইটে’র চতুর্থ দিন আজ। বোমা বিস্ফোরণে হতাহত এবং থেমে থেমে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে থমথমে আতিয়া মহল এলাকা।

জঙ্গিদের নিষ্ক্রিয় করতে আজ ২৭ মার্চ সোমবার অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা বিাহিনীর সদস্যরা।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সোমবার সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত একটানা গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত থেমে থেমে গুলি চলেছে। এরপর সাড়ে আটটা পর্যন্ত কোনো শব্দ শোনা যায়নি।

এদিকে রোববার ২৬ মার্চ বিকেলে সেনাবাহিনীর এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয় অভিযানে দুই পুরুষ জঙ্গি নিহত হয়েছে। এছাড়া ভেতরে আরও এক বা একাধিক জঙ্গি জীবিত রয়েছে ।

ব্রিফিংয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান বলেন, জঙ্গিরা পুরো ভবনে বিভিন্ন বিস্ফোরক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখায় তা ঝুঁকিপূর্ণ। জঙ্গিরা ওয়েল ট্রেইনড ও ইক্যুইপড। তাদের কাছে ছোট অস্ত্র, বোমা, আইইডি আছে। আমরা যে গ্রেনেড মেরেছি, তারা উল্টো আমাদের দিকে ছুড়ে মেরেছে। এক্সপ্লোসিভ ফোটাচ্ছে। সবার সুইসাইডাল ভেস্ট লাগানো আছে।

অভিযান শেষ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখনও বলা যাচ্ছে না অপারেশন কখন শেষ হবে। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। নিচ থেকে জায়গায় জায়গায় আইইডি লাগানো রয়েছে। বিস্ফোরক রয়েছে। নড়াচড়া করাটা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে আমাদের কমান্ডোরা ঝুঁকি নিয়ে চেষ্টা করছে। বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে জঙ্গিদের নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছে। নিশ্চিত করে বলতে পারছি না ঠিক কখন অপারেশন শেষ হবে। অপারেশন খুবই ডিফিকাল্ট হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আতিয়া মহলের আটকে পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার করাই ছিল আমাদের প্রথম লক্ষ্য। তাদের উদ্ধার করতে পেরেছি ভালোভাবে।

তিনি জানান, দুই জঙ্গিকে দৌড়াতে দেখে কমান্ডোরা গুলি চালায়। গুলিতে দুই জঙ্গি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এদের একজন মাটিতে পড়ার পর সুইসাইড ভেস্ট বিস্ফোরণ ঘটায়। ভেতরে জীবিত আরও একাধিক জঙ্গি রয়েছে। তারা সুইসাইড ভেস্ট পরে আছে। এজন্য আমরা সতর্ক হয়ে কাজ করছি। নারী জঙ্গি রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।

সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য আহত হননি বলে জানান ফখরুল আহসান।

শনিবারের হামলার সঙ্গে আতিয়া মহলের জঙ্গিদের যোগসূত্র আছে কিনা, সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল আহসান বলেন, সেটা পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা তদন্ত সাপেক্ষে বলতে পারবে।

২৫ মার্চ শনিবার সকাল নয়টা থেকে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শুরু করে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো বাহিনী। রোববারও এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সকাল থেকেই থেমে থেমে অভিযানস্থল ও আশপাশ থেকে বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লোকজনকে রাস্তায় না বের হওয়ার জন্য মাইকে ঘোষণা দিয়েছেন। আশপাশের এলাকা ও রাস্তায় কোনোও লোকজনকে দেখা যাচ্ছে না। সব দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। পুরো এলাকায় থমথমে বিরাজ করছে।

এর আগে রোববার সকালে জঙ্গি আস্তানা আতিয়া মহলের আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। শনিবার রাতে বিস্ফোরণের পর থেকে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকবে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, দক্ষিণ সুরমার হুমায়ূন রশীদ চত্বর, সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক, পাড়াইরচক থেকে পীর হবিবুর রহমান চত্বর পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ও জোটবদ্ধভাবে চলাফেরা না করার জন্য।

২৫ মার্চ শনিবার আতিয়া মহলের কাছাকাছি দু’দফা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৬ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় সাংবাদিক, পুলিশ, র‌্যাব সদস্যসহ আহত হয়েছেন ৪৫ জন।

নিহতরা হলেন- সিলেট মহানগর পুলিশের পরিদর্শক চৌধুরী মো. আবু কায়সর, জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) মনিরুল ইসলাম, মদনমোহন কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওয়াহিদুল ইসলাম অপু, দক্ষিণ সুরমা উপজেলা ছাত্রলীগের উপ পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফাহিম, নেত্রকোনার পূর্বধলার ইছুলিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম। অন্যজনের পরিচয় সকালে জানা গেছে। তিনি হচ্ছেন খাদিম শাহ, তিনি শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কাজ করতেন বলে জানা গেছে।

শনিবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পুলিশের একটি চেকপোস্টের কাছে একটি এবং রাত আটটার দিকে পূর্ব পাঠানতলা এলাকায় আরেকটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

বোমা বিস্ফোরণের পর হতাহতের জন্য দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এই গোষ্ঠীর কথিত বার্তা সংস্থা ‘আমাক’ এই খবর দিয়েছে বলে জানিয়েছে অনলাইনে জঙ্গিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ।

ওই দিন বিস্ফোরণের আগ মুহূর্তে সন্ধ্যা ছয়টা ২০মিনিটের দিকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফখরুল আহসান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো টিমের ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ এখনও চলছে। এই অভিযান কখন সমাপ্ত হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

শনিবার তিনি আরও জানান, আতিয়া মহলের ভেতর থেকে এখন পর্যন্ত আটকাপড়া ৭৮ জনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। ওই ভবনে বসবাস করা পরিবারগুলোর আর কেউ ভেতরে নেই। তবে ভেতরে বেশ কয়েকজন জঙ্গি এখনও অবস্থান করছে। তবে কয়জন আছে, তা জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত অভিযানের সময় জঙ্গিরা ১২টি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ।

এর আগে ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ভবনটি প্রথম ঘেরাও করে পুলিশ। ভবনের ২৯টি ফ্ল্যাটের একটি স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া নেয় জঙ্গিরা। বাকি ২৮টিতে বসবাসরত বাসিন্দারা আটকা পড়েন।

২৪ মার্চ শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে অভিযান চালাতে ঢাকা থেকে সিলেটে আসে ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোয়াত অভিযান চালায়নি। শুক্রবার সন্ধ্যার পর সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সারারাত ঘিরে রাখার পর শনিবার সকাল নয়টার দিকে প্যারা কমান্ডোর দলটি উদ্ধার অভিযান শুরু করে।

শনিবার আটকা পড়া বাসিন্দাদের উদ্ধার অভিযানের পর থেকে আতিয়া মহল ঘিরে কখনো থেমে থেমে, কখনো একনাগাড়ে গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। অভিযান চলমান অবস্থায় শনিবার সন্ধ্যায় আতিয়া মহলের কাছাকাছি দুটি জায়গায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

Print Friendly, PDF & Email
 

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password

%d bloggers like this: