‘লকডাউন’ আতঙ্কে বাজার

0
244

সময়ের সঙ্গে দেশে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ‘হোম কোয়ারেন্টিনের’ পর এবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে ‘লকডাউন’ প্রসঙ্গ। এ নিয়ে ইতোমধ্যে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। লকডাউনের আতঙ্কে আগে থেকে একসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাজারের তালিকা নিয়ে দোকানে ছুটছেন সাধারণ মানুষ। বিগত কয়েক দিন ধরেই চলছে এমনটি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও আতঙ্ক কাটছে না। এখনো চাহিদার চেয়ে বেশি পণ্য কিনছেন অনেকেই।

গতকাল কারওয়ানবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার বাজার ও নিত্যপণ্যের দোকান ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যদিনের তুলনায় বিগত কয়েক দিন ধরে বাজারে ক্রেতার চাপ বেড়েছে। মুদি দোকানগুলোতে বিক্রি বেড়েছে বেশি। সবাই মূলত একসঙ্গে চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মসলাজাতীয় পণ্য কিনছেন বেশি।

এদিকে বাজারে ক্রেতার চাপ বেশি হওয়ায় দরকষাকষি ছাড়াই পণ্য কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ ক্রেতাদের। কারওয়ানবাজারের কিচেন মার্কেটে কথা হয় আবু সুফিয়ান নামে এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, হঠাৎ ক্রেতা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রেতারা এক রকম এক দামেই পণ্য বিক্রি করছেন। দাম মলামলির সুযোগ মিলছে না। এ যেন ‘নিলে নেন, না নিলে রাস্তা মাপেন’ অবস্থা।

বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, গত মঙ্গলবার থেকে ক্রেতার চাপ বেড়েছে। ওই দিন লকডাউনের বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আগাম কিনে রাখতে শুরু করেছেন। যার বাসায় মাসে ২০ কেজি চাল লাগে, দেখা যাচ্ছে তিনি এক বস্তা (৫০ কেজি) কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ২ কেজি পেঁয়াজের বদলে কিনছেন এক পাল্লা করে। ২ কেজি ডালের বদলে ৫ কেজি কিংবা তার বেশি ডাল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

কারওয়ানবাজারের লাকসাম ট্রেডার্সের চাল ব্যবসায়ী মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, মানুষ চালের দোকানেই ভিড় করছেন বেশি। সাধারণ দিনের তুলনায় বিগত কয়েক দিন ধরে চালের

বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। করোনায় গৃহবন্দি হয়ে পড়ার ভয়ে বেশি করে আগাম চাল কিনছেন সবাই।

এ সুযোগে চালের দামও বেড়েছে সপ্তাহের ব্যবধানে। মিনিকেট, আটাশসহ অন্য চালের কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা করে বেড়ে গেছে বলে জানান মোশাররফ। বস্তায় বেড়েছে প্রায় ৫০ টাকা। মিল থেকেই বাড়তি দামে চাল বিক্রি হওয়ায় বাজারেও দাম বেশি বলে জানান তিনি।

খাদ্যমন্ত্রী সাধনচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, দেশে চাল ও গমের মজুদ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রয়েছে। সরকারি গুদামে বর্তমানে সোয়া ১৪ লাখ টন চাল মজুদ আছে। সুতরাং চাল-গম নিয়ে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে কেউ দাম বাড়াতে চাইলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথচ বাজারে এখনো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে চাল।

বাজারে দাম বাড়ার তালিকায় আরও রয়েছে মসুর ডাল, চিনি, ডিম ও আলু। মসুর ডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০-১১০ টাকায়। পাঁচ দিন আগেও যা ছিল ৯০-১০০ টাকা। চিনি কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায়। ফার্মের ডিম ডজনে (১২ পিস) ১০ টাকা দাম বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। গত সপ্তাহে যা ছিল ৯০ টাকা। খুচরাবাজারে আলুর দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। গত সপ্তাহে ১৮-২০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া আলু বর্তমানে ২২-২৫ টাকা কেজি। অন্যদিকে পেঁয়াজের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও চায়না রসুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬০-১৮০ টাকায়।

বাজারে গুঁড়াদুধসহ বিদেশি শিশুখাদ্য ও ডায়াপারের দামও বাড়তি। সেই সঙ্গে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও বিভিন্ন জীবাণুনাশকের দাম এখনো বাড়তি। সরবরাহ ঘাটতি দেখিয়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডায়াপারের দাম প্যাকেটপ্রতি বেড়েছে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা পর্যন্ত।

শান্তিনগর বাজারের ব্যবসায়ী হানিফ মিয়া জানান, করোনার কারণে সরবরাহ কম থাকায় আমদানি করা গুঁড়াদুধের দাম বেড়েছে। ১ হাজার ৮০০ গ্রামের যে জার আগে ছিল ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা; এখন তা ৩ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে আমদানি করা পণ্যের সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমদানি ২৫-৩০ শতাংশ বেশি। সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে বাজারে হামলে পড়ে প্রয়োজনের বেশি পণ্য না কেনারও আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত পণ্য থেকে লোকজনকে বিরত রাখতে মাঠে নেমেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মীরা।

সঠিক ও স্পষ্ট তথ্যের অভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে এমন বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, যখন তথ্যের ঘাটতি থাকে তখনই সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নানা ধরনের গুজবেও তখন কান দেন তারা। তাই সরকারের উচিত স্পষ্ট তথ্য সরবরাহের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা।

বেশি দামে পণ্য বিক্রির জন্য জেলা-উপজেলায় ব্যবসায়ীদের জরিমানার খবর পাঠিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা

ওসমানীনগর : সিলেটের ওসমানীনগরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৮ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ২১ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। গতকাল এই আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোসা. তাহমিনা আক্তার। এর মধ্যে উপজেলার গোয়ালাবাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা না থাকায় এবং বেশি দামে পণ্য বিক্রি করায় ৬ প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই কারণে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফছানা তাছলিম তাজপুর বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আরও দুই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

কালীগঞ্জ : চালের মূল্য তালিকা না থাকা এবং বিক্রি করা চালের ভাউচার না দেখাতে পারায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরের ৩ ব্যবসায়ীকে ২৬ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই দিন সকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও প্রাইভেট পড়ানোর অপরাধে চাপরাইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক উত্তম কুমার ও নলডাঙ্গা ভূষণ নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাজনীন আক্তারকে জরিমানা করা হয়। এ আদালতটি পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কালীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভুপালী সরকার।

উল্লাপাড়া : সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় করোনা ভাইরাস আতঙ্কের সুযোগে বেশি দরে চাল বিক্রি করায় পৌর শহরের ঘোষগাঁতী গ্রামের অনিল কু-ুর ছেলে পিন্টু কু-ুকে ৩ হাজার ও সদর ইউনিয়নের বাখুয়া গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে আবদুল মালেককে ২ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ফেনী : ফেনীতে বেশি দামে চাল বিক্রির দায়ে গতকাল ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযানে চালের দুই ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে রহমান ব্রাদার্সকে তিন হাজার ও কবির আহাম্মদ সওদাগরকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সাভার : বেশি দামে চাল বিক্রি করায় সাভারের নামাবাজার এলাকায় চালের আড়তে তিন ব্যবসায়ীকে নগদ দেড় লাখ টাকা জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুুল্লাহ আল মাহফুজ।

গাইবান্ধা : বেশি দামে মাস্ক বিক্রি করায় গতকাল গাইবান্ধা শহরের দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুস সালাম। প্রতিষ্ঠান দুটি হচ্ছে শহরের স্টেশন রোডের সকাল-সন্ধ্যা কসমেটিকস ও পার্ক রোডের আলিম।