breaking news New

রোহিঙ্গারা ফের আসছে

রোহিঙ্গাদের আবারো বাংলাদেশমুখী করছে বিভিন্ন দেশ। গত সপ্তাহে ১৩ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে সৌদি আরব। ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকেও সম্প্রতি সাত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মিয়ানমারে ফিরে আবার নির্যাতনের মুখে পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে গত মঙ্গলবার মিয়ানমার সরকার ঘোষণা করেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশের বাদবাকি রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর তাদের সেনারা পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এর ফলে তারা আবারো বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে আসছে। ফলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে গত সোমবার রাত ২টার দিকে সৌদি এয়ারলাইন্সে করে ১৩ রোহিঙ্গা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়। জানা গেছে, এসব রোহিঙ্গার বেশিরভাগ ২০১১ সালের পর মিয়ানমারের নিপীড়ন এড়াতে ও জীবিকার তাগিদে ভুয়া পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যায়।

১৯৭৩ সালে বাদশা ফয়সালের সময় মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গাদের সৌদিতে আশ্রয় দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে সৌদি আরবেই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার বসবাস। কিন্তু এখন দেশটির সরকার তাদের আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। ১৯৫১ সালে রিফিউজি কনভেনশন অনুযায়ী কোনো শরণার্থী নীতি নেই সৌদি আরবের। ফলে শরণার্থীদের কাজের অনুমতি কিংবা চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয় না দেশটির।

ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সাত রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ফলে মিয়ানমারে ফিরে আবার নির্যাতনের মুখে পড়ার ভয়ে আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ রেজাউল করিম ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত এক সপ্তাহে ভারত থেকে পালিয়ে আসা ৭৪ জন রোহিঙ্গাকে ট্রানজিট পয়েন্টে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আরো ১৮ জন রোহিঙ্গা ভারত থেকে এসেছে। তাদের যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে। শুনেছি অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ দিনে ১১১টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৪৬৮ জন সদস্য কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রাবার বাগানের কাছে স্থাপিত ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। এরা সবাই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। নতুন আসা এসব সদস্য জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তারা মূলত ভারতের জম্মু-কাশ্মিরের কেরাইনটেলা এলাকা থেকে পালিয়ে এসেছেন।

উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, চলতি মাসে ভারত থেকে পালিয়ে আসা প্রায় অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা সদস্য পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এদের বেশিরভাগই শিশু ও নারী। এসব রোহিঙ্গাকে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্টে রাখা হয়। পরে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত সোমবার মিয়ানমার সরকার ঘোষণা করেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর তাদের সেনারা পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর দমন অভিযানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এ নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করেছেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে তারাও উদ্বিগ্ন।

এই যখন অবস্থা তখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে উল্টো বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে এখন কাজ করতেই পারছে না জাতিসংঘ। এ ছাড়া সৌদি আরব ও ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা নিয়েও কিছু বলছে না জাতিসংঘ। এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে জাতিসংঘের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর সমালোচনাও করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় ওই সংস্থাগুলোকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথাযথভাবে কাজ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সদস্য, বিভিন্ন এজেন্সির প্রতিনিধি, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের প্রতিনিধিসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বলছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের তাগিদ কম। প্রায় দুই মাসের বিরতিতে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের সভায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ মাসের জন্য ৯৫১ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল জাতিসংঘ। ওই তহবিলের ৮০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে এ বছরের খসড়া পরিকল্পনার ৯২১ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা) সঙ্গে গত বছরের অবশিষ্ট তহবিলও যুক্ত হবে।

বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ইউএনডিপি ও ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছে। কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তাদের রাখাইনে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ইউএনএইচসিআর প্রধান ফিলিপো গ্র্যান্ডি রাখাইন সফর করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও মিয়ানমার তাতে রাজি হয়নি। বর্তমানে গোলযোগের কারণে প্রতিদিন সেখানকার অবস্থা খারাপ হচ্ছে এবং রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে কাজ করছে এমন কোনো জাতিসংঘ সংস্থা বা তাদের সদর দফতর কোনো বিবৃতি ইস্যু করেনি যার মাধ্যমে গোটা বিশ্ব জানতে পারে রাখাইনে কী ঘটছে। তারা যদি বিবৃতি দিত, তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলে মিয়ানমারের বিষয়ে আরো শক্ত অবস্থান নেওয়া সম্ভব হতো বলে তিনি জানান।

এ নিয়ে আরেক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে কিছু ঘটলেই সে বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে বিবৃতি দেয়, অন্যদিকে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে তারা কিছুটা ভিন্ন ভূমিকা নেয়।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। কিন্তু রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ তৈরি হলে এবং রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে রাজি হলে তাদের পাঠানো হবে। রোহিঙ্গারা তাদের নিরাপত্তা, জীবনযাপনের জন্য ব্যবস্থা ও অন্যান্য মৌলিক অধিকারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন।

মতামত দিন

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register