breaking news New

মন্ত্রী হতে এমপিদের চাপ

আসন্ন মন্ত্রিসভায় স্থান করে নিতে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ওপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনেকেই। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দিয়ে তারা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করছেন। এসব কর্মসূচিতে পছন্দের সাংসদদের ‘গুণকীর্তন’ করা হচ্ছে।

মন্ত্রিসভা গঠনের আগে দলীয় হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাতেই এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নবনির্বাচিত অনেক সংসদ সদস্যের নামে ফ্যানপেজ খোলা হয়েছে। এসব পেজের মাধ্যমে তাদের মন্ত্রিত্ব প্রদানের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। উপরন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাতে গণভবনে গেছেন যেসব নেতা, তাদের অনেকেই সুযোগ বুঝে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কাছেই অনুরোধ রেখেছেন তাদের পছন্দের সাংসদকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে।

এককথায় বিভিন্ন এলাকার মানুষ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আসনের সাংসদকে মন্ত্রী করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী এসব সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি ব্যক্তিগত বিবেচনা থেকেই শেষ পর্যন্ত তার পছন্দের মানুষদের দিয়েই মন্ত্রিসভা সাজাবেন।

দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি। কাকে মন্ত্রী করা হবে-সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে সেটি তিনিই চূড়ান্ত করবেন। তাই তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তৃণমূলসহ মন্ত্রিত্বপ্রত্যাশী নেতারা। নিজ নিজ এলাকার এমপিদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করার দাবিতে অনেক স্থানেই এখন মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের উদ্যোগে।

আগামীকাল সোমবার নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন। বিকাল সাড়ে তিনটায় বঙ্গভবনে শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এর আগে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ হাসিনাকেও শপথ পড়াবেন তিনি। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও তাকে শপথ পাঠ করানোর এখতিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের। গত বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের নবনির্বাচিত ২৮৯ এমপি শপথ নেন। পরে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের সভায় সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। এর পর তিনি বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় বিধি অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন হিসেবে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রপতি।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। কোনো কোনো আসনে দুই বা তিন লাখ ভোটেও প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। তাই এবার প্রতিটি সাংসদের এলাকার কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। সারাদেশের প্রায় সব এলাকার তৃণমূল নেতারা তাদের আসনের এমপিকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তৃণমূল নেতাদের মতে, মন্ত্রিসভায় এলাকার প্রতিনিধি থাকলে এলাকার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।

এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কাছে যে কোনো সমস্যা তুলে ধরলে এর প্রতিকারও অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। এ কারণেই তারা মন্ত্রিসভায় নিজ এলাকার প্রতিনিধিদের প্রত্যাশা করছেন। বিদায়ী মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যেও কাউকে কাউকে এবার পূর্ণ মন্ত্রী করার দাবি তুলছেন। উপরন্তু অনেক এমপি নিজেও লবিং-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের নামটি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে।

আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক টানা চতুর্থবারের মতো টাঙ্গাইল-১ আসন থেকে এমপি হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর মহাজোট সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে পূর্ণমন্ত্রী করার দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের তৃণমূল নেতারা।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এবার নিয়ে টানা তৃতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে। এলাকার তৃণমূল নেতারা মন্ত্রিসভায় দেখতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এই বিশেষ সহকারীকে। আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন থেকে এবার নিয়ে টানা তিনবার এমপি হয়েছেন চাঁদপুর-৩ আসন থেকে। মহাজোট সরকারের প্রথম মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও ২০১৪ সালের পর তিনি বাদ পড়েন। আবারও তাকে মন্ত্রিসভায় দেখতে প্রত্যাশী এলাকাবাসী।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি আওয়ামী লীগের দুই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান এবং দুই সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও বিএম মোজাম্মেল হক। তবে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে দলের নির্বাচন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তারা। মনোনয়নবঞ্চিত এই চার নেতার ‘ত্যাগ’কে মূল্যায়ন করে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন তাদের এলাকার নেতাকর্মীরা। মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীকেও মন্ত্রিসভায় দেখতে চান তার নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীরা।

সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন জয়পুরহাট-২ এবং খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দিনাজপুর-২ আসন থেকে টানা তিনবারের নির্বাচিত এমপি। তাদের মন্ত্রিসভায় দেখতে প্রত্যাশী ওই দুই জেলার নেতারা। অপর দুই সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম ও ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবারই প্রথম এমপি হয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভায় এ দুজনের ঠাঁই হবে বলে প্রত্যাশা করছেন নেতাকর্মীরা।

দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য ও বরিশাল জেলা সভাপতি আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে এবার নিয়ে চারবার এমপি হয়েছেন বরিশাল-১ আসন থেকে। ১৯৯৬ সালে পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্ব লাভের পর বর্তমানে পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তাকেও আসন্ন মন্ত্রিসভায় দেখতে চান তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ।

বিদায়ী মন্ত্রিসভার অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এবার নিয়ে টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে। তাকে এবার পূর্ণমন্ত্রী করার দাবি উঠেছে। সাতক্ষীরা-৩ আসন থেকে এবার নিয়ে টানা তিনবার এমপি হয়েছেন ডা. আ ফ ম রুহুল হক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী করা হয়েছিল। নতুন মন্ত্রিসভায় তাকে আবারও মন্ত্রী করার দাবিতে সাতক্ষীরায় বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন হয়েছে স্থানীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের টানা তিনবারের এমপি এসএম জগলুল হায়দারকে মন্ত্রিসভায় দেখতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন তার আসনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

একই ভাবে কুড়িগ্রাম-৪ আসনের টানা দ্বিতীয়বারের এমপি জাকির হোসেনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির দাবিতে গত শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করেছে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলা ছাত্রলীগ। পটুয়াখালী-৪ আসনের নবনির্বাচিত এমপি অধ্যক্ষ মহিবুর রহমান মহিবকে মন্ত্রী করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন তার নির্বাচনী এলাকার সর্বশ্রেণির মানুষ।

মাগুরা-২ আসনের এমপি বীরেন শিকদারকে এবার পূর্ণমন্ত্রী করার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন তার অনুসারীরা। এবারই প্রথম মাগুরা-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস অ্যাডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর। তাকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চান মাগুরার তৃণমূল নেতারা। এবারের নির্বাচনে অন্যতম চমক ছিল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। মাশরাফিকে মন্ত্রী করার দাবিতে গতকাল সকালে নড়াইল প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে।

একইভাবে প্রথমবার নির্বাচিত চাঁদপুর-৪ আসনের এমপি ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমানকে মন্ত্রিসভায় চাইছেন চাঁদপুরের নেতাকর্মীরা। পটুয়াখালী-২ আসন থেকে সাতবারের নির্বাচিত এমপি ও বিদায়ী সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তার জেলার নেতাকর্মীরা। শেরপুর-১ আসনে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতীয় সংসদের হুইপ আতিউর রহমান আতিককে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান শেরপুরের সুধীমহল, নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গ্রুপ খুলে গাইবান্ধা-১ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির নেতা ব্যারিস্টার শামিম হায়দার পাটোয়ারীকে মন্ত্রী করার জন্য দাবি জানানো হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে মন্ত্রী করার দাবি জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদ। গত বুধবার পোস্টার ও ব্যানারের মাধ্যমে এ দাবি তুলে ধরা হয়। লালমনিরহাট-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার হোসেনকে মন্ত্রী করার প্রত্যাশায় প্রতিনিয়ত পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ চলছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের উদ্যোগে।

কক্সবাজার-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সাইমুম সরওয়ার কমলকে মন্ত্রী করার দাবিতে বিভিন্ন আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও তার নামে গ্রুপ ও লাইক পেজ খুলে এ দাবি জানাচ্ছেন তার শুভানুধ্যায়ীরা। ময়মনসিংহ-৭ আসন থেকে নির্বাচিত রুহুল আমিন মাদানীকে মন্ত্রী করার দাবি জানিয়েছেন ত্রিশালবাসী। ত্রিশালের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফেসবুকে তাকে উন্নয়নের রূপকার, এলাকার অনিবার্য পুরুষ এসব অভিধা দিয়ে এ দাবি তুলে ধরেছেন।

চাঁদপুর-৫ আসন থেকে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তিবাসী। গত শুক্রবার তার শুভানুধ্যায়ীরা এ দাবিতে একাধিক মানববন্ধন করেছেন। মৌলভীবাজার-৪ আসন থেকে নির্বাচিত ‘উপধ্যক্ষ আবদুস শহীদকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই’ স্লোগানে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় চা-শ্রমিকরা। গত বৃহস্পতিবার তার আসনের বিভিন্ন চা-বাগানের পাশে এ দাবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে মানববন্ধন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা বলছেন, এর আগে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় হাতেগোনা কয়েকটি আসন থেকে তাদের এমপিকে মন্ত্রিসভায় রাখার দাবি উঠেছিল। কিন্তু এবারই প্রথম সারাদেশে ব্যাপক হারে নেতাকর্মীরা তাদের নিজ নিজ এমপিকে মন্ত্রিসভায় রাখার দাবি তুলছেন।

মতামত দিন

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register