breaking news New

নেইমারই ফুটবলের রাজপুত্র

বিডিনিউজটাইমস স্পোর্টস ডেস্কঃ নেইমার- বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ভালবাসার এক নাম। ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতবে নেইমারের জাদুকরী দক্ষতায়- এমনটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু কীভাবে ব্রাজিলের সাও পাওলোর সেই ছোট্ট শিশুটি আজকের বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হলেন- সে গল্পটি কি সবার জানা আছে? চলো, জেনে নেওয়া যাক নেইমারের ছেলেবেলার গল্প।

নেইমারের জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি, ব্রাজিলের সাও পাওলোতে। তার পুরো নাম ‘নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র’। বাবার নাম ‘নেইমার সিনিয়র’, তিনি ছেলেকে আদর করে ‘জুনিনহো’ বা জুনিয়র বলে ডাকেন। বাবা নিজেও ছিলেন একজন ফুটবলার, কিন্তু সেভাবে বড় কিছু করতে পারেননি। স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে দিয়েই পূরণ করাবেন ব্রাজিলের জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন। ছেলেকে বড় করে তুললেনও সেভাবেই- শিশু নেইমার হাঁটতে শেখার আগেই ফুটবলে লাথি মারা শিখে গেলেন! আরেকটু বড় হলে বাবা তাকে নিয়ে গেলেন খেলার মাঠে। কিন্তু ফুটবল খেলতে নয়, ফুটসাল খেলতে! (ফুটসাল হচ্ছে ইনডোরে, কম খেলোয়াড় নিয়ে ফুটবল)। সেখানে চমৎকার খেলে নেইমার সবার নজরে আসেন। সবাইকে পাশ কাটিয়ে বল পায়ে জাদুকরী দক্ষতায় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন তিনি দর্শকদের। স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম সাফল্য আসে- যখন মাত্র ১১ বছর বয়সে ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব সান্তোসের যুবদলে খেলার সুযোগ পান তিনি। ২০০৯ সালে মাত্র সতের বছর বয়সে পেশাদারী ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে। সে বছরই সেরা খেলোয়াড় হিসেবে এওয়ার্ড জিতে নেন তিনি। ২০১০ সালে ধূমকেতুর মতো উত্থান ঘটে নেইমারের। সান্তোসকে লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ, কোপা দো ব্রাজিল চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানো ছাড়াও টানা চারবার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন তিনি। ২০১১ সালে সান্তোসকে ৪৮ বছরের ভেতর প্রথমবারের মতো কোপা চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানোর পথে নেইমার এমন একটি অসাধারণ গোল করেন- যেটি ফিফা বর্ষসেরা গোল হিসেবে মনোনীত করে!

এছাড়াও সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে শুধু ব্রাজিলের নয়, গোটা দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ফুটবলার হিসেবেও এওয়ার্ড জিতে নেন নেইমার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, নেইমারের ক্যারিয়ারের গতিপথ একদমই ভিন্ন হতে পারতো। কারণ তার বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর, তখন খোদ রিয়াল মাদ্রিদ থেকে তার জন্য মোটা অঙ্কের বেতনের প্রস্তাব আসে। কিন্তু সান্তোস তাদের এই অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়টিকে হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। তাই তারা রিয়াল মাদ্রিদের চেয়েও বেশি বেতন দিয়ে নেইমারকে রেখে দেয় নিজেদের কাছে! এই বিশ্বাসের প্রতিদানে নেইমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য উপহার দিয়েছেন সান্তোসকে।

কিন্তু সান্তোসে আর কতোদিন? নেইমারের মতো এতো বড় মাপের আন্তর্জাতিক মানের তারকাকে নিজেদের কাছে ধরে রাখা সম্ভব নয়- সেটা সান্তোসও বুঝতে পেরেছিলো। ২০১৩ সালে নেইমার পাড়ি জমালেন বার্সেলোনায়, নতুন ঠিকানায়। সেখানে তখন রাজত্ব করছেন মেসি, সুয়ারেজের মতো কিংবদন্তী খেলোয়াড়। তাদের সাথেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানে সমান দক্ষতা প্রমাণ করে গেলেন বয়সে নবীন নেইমার। তিনজন মিলে বার্সেলোনাকে জেতালেন অনেক অনেক ট্রফি। ২০১৪-১৫ মৌসুমে অসাধারণ নৈপুণ্যে ৩৯ গোল করে বার্সেলোনাকে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ট্রেবল জেতায় মুখ্য ভূমিকা রাখেন তিনি।

২০১৭ সালে তিনি বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে যোগ দেন ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে- রেকর্ড গড়েন পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফুটবলার হিসেবে। এতো বিখ্যাত, সফল এবং ধনী হওয়ার পরও নেইমার নিজেকে একদমই বদলাননি। একদম ছেলেবেলায় তাকে এক ইন্টারভিউতে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘তুমি কেন ফুটবলার হতে চাও?’ তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘যেন আমি আমার পরিবারের যত্ন নিতে পারি। টাকা-পয়সা নিয়ে যেন আমার বাবা-মাকে কোনদিন ভাবতে না হয়।’ নেইমার তার কথা রেখেছেন। অনেক খেলোয়াড়েরই একটু খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত পেলে মাথা ঘুরে যায়, ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে। কিন্তু নেইমার এখনও পরিবারকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসেন। প্রিয় বোন রাফায়েলার ছবি নিজের বাহুতে ট্যাটু করে রেখেছেন তিনি। এখনও নেইমারের বাবা সবসময় তার পাশে থাকেন। তার টাকা-পয়সার হিসেব থেকে শুরু করে সবকিছুর দেখভাল করেন। মায়ের জন্য নেইমারের ভালবাসার তুলনা নেই। মাকে কাছে পেলে সব কষ্ট ভুলে যান তিনি। এভাবেই পরিবারকে পাশে নিয়ে এগিয়ে চলেছে নেইমারের জয়যাত্রা!

Motivational Talks সিরিজ!

শুধু ক্লাবেই নয়, ব্রাজিলের জাতীয় দলেও তিনি দারুণ সফল খেলোয়াড়। ২০১০ বিশ্বকাপেই তার খেলার কথা ছিল। কিন্তু তৎকালীন ব্রাজিলিয়ান কোচ দুঙ্গা তাকে দলে রাখেননি। পেলে, রোনালদো থেকে শুরু করে সবাই কোচকে অনুরোধ করেন। হাজার হাজার ভক্ত পিটিশন করে নেইমারকে দলে নিতে। কিন্তু দুঙ্গা দলে নিলেন না নেইমারকে, বললেন নেইমার এখনও অপরিণত। সেই অবহেলিত নেইমার এখন পেলে এবং রোনালদোর পরই ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। যেভাবে খেলে যাচ্ছেন, এক নম্বর আসনটিও দখল করে নিতে পারেন ভবিষ্যতে! এই বিশ্বকাপেও নেইমার তার জাদুকরী ফুটবল দক্ষতায় ব্রাজিলের স্বপ্ন পূরণ করবেন- এমনটাই ভক্তদের প্রত্যাশা।

মজার কিছু তথ্য!

ব্রাজিলের ইতিহাসে পেলে, রোনালদো, কাকা, রোনালদিনহো থেকে শুরু করে কিংবদন্তী ফুটবলারের অভাব নেই। কিন্তু নেইমারই একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার, যিনি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ TIME ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়ার অনন্য সম্মান অর্জন করেছেন।
নেইমার মাত্র ১৯ বছর বয়সে এক সন্তানের বাবা হন! তিনি বলেন, ‘আমি তো প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম এতো কম বয়সে এতো বড় দায়িত্ব কীভাবে নেবো ভেবে! কিন্তু এখন আমার সন্তানের হাসিমুখই আমার কাছে সবকিছু!
নেইমারের ক্যারিয়ারে অত্যন্ত কাকতালীয় একটি ব্যাপার আছে। তার যেদিন বিশতম জন্মদিন ছিলো, ঠিক সেদিনই তিনি পেশাদার ক্যারিয়ারের শততম গোল পূর্ণ করেন! এমনটি ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি!

নেইমার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এ ব্যাপারে তিনি আদর্শ মানেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী কাকাকে। তিনি নেইমারের বড় ভাইয়ের মতোই। কাকার আদর্শ অনুযায়ী নেইমার সবসময় তার আয়ের ১০% অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে থাকেন।
তাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ‘Marketable’ খেলোয়াড়। কেবল নেইমারের ছবি দিলেই যে কোন পণ্যের বিক্রি হু হু করে বেড়ে যায়! বিজ্ঞাপনের বাজারে নেইমারের সাফল্য এতো বেশি, যে তাকে নিয়ে একটি শব্দই তৈরি হয়েছে- ‘Neymarketing’!
নেইমার ভীষণ মাতৃভক্ত। মায়ের জন্য সবকিছু ছাড়তে পারেন তিনি। পরিবারের প্রতি ভালবাসার জন্য তিনি সবার কাছে প্রশংসিত।
নেইমার ফুটবল খেলার পাশাপাশি শখের বশে গানও করেন! ‘Neymusico’ নামে তিনি মাঝেমধ্যেই গান গেয়ে থাকেন। বন্ধুদের পার্টিতে প্রায়ই দেখা যায় নেইমার গান করছেন।

শেষ করছি নেইমারের একটি উক্তি দিয়ে।
“If you are not hated, you are doing it wrong.”
নেইমারকে প্রায়ই বিভিন্ন সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সেগুলো তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। খেলার ফলাফল দেখলেই বোঝা যায় কে সফল আর কে ব্যর্থ। তাই নেইমার বলেন, সাফল্য পেতে চাইলে সমালোচনাকে ভয় করলে চলবে না। তোমার কাজ বিজয় ছিনিয়ে আনা, কে কী বললো সেটা শোনার কোন মানে হয়না। দিনের শেষে স্কোরবোর্ডই বলবে কে আসল বিজয়ী।

মতামত দিন

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register