নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে সেমিনার

জাকের আলী শুভ: কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলা প্রশাসন মিলনায়তনে নিজেরা করি সংগঠনের উদ্যোগে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বিষয়ক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার ১১ডিসেম্ভর ২০১৬ বেলা ১১টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অ:দা:) পীজুস চন্দ্র দে’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমারখালী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুর মান্নান খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আনিছা আফরোজ, নিজেরা করি বিভাগীয় সংগঠক দীপক বকসী প্রমুখ।

সেমিনারে নিজেরা করি সংগঠন’র কুমারখালী অঞ্চল সমন্বয়ক মোঃ কামাল হোসেন স্বাগত বক্তব্য রাখেন। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও বাল্য বিবাহের কুফল সর্ম্পকে আলোকপাত করেন বক্তারা। সেমিনারে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবি অংশগ্রহন করেন।

এ সময় বক্তরা বলেন ‘একটি সুস্থ জাতি পেতে প্রয়োজন একজন শিক্ষিত মা’— এই উক্তিটি প্রখ্যাত মনীষী ও দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্টের। অথচ আজ এই একুশ শতকে এসেও বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ নারী এখনো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আর এর প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে উঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও বাল্য বিবাহ একটি বড় বাধা।

নারীর ক্ষমতায়নে প্রধানতম বাধা হিসেবেও বাল্যবিবাহকে চিহ্নিত করা যায়। বাল্য বিবাহের শিকার ছেলে বা মেয়ে সে যাই হোক না কেন; সে তার উচ্চ শিক্ষা এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে শিশু শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত শিশু, কিশোরী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কিশোররাও উন্নত জীবন ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তিগত তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত।

বাল্য বিবাহ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় দীর্ঘকালীন সমস্যা। সুপ্রাচীন কাল থেকে এটি প্রথা হিসেবে এ দেশে বিদ্যমান হয়ে সামাজিক ব্যাধিতে পরিনত হয়েছে। এ অমানবিক প্রথা মানুষকে অবমূল্যায়ন করছে। বৃদ্ধি করছে সামাজিক সমস্যা, বয়ে নিয়ে আসছে মানব সমাজে অনাকাঙ্খিত দুঃখ দুর্দশা। আমাদের পারিবারিক নানা সমস্যা যেমন- দাম্পত্য কলহ, অশান্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা এসবের জন্য দায়ী মূলত বাল্য বিবাহ।

সাধারণ ভাবে শৈশব কাল অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে যে বিবাহ সম্পন্ন হয় তাই বাল্য বিবাহ। অর্থাৎ সরকার স্বীকৃত বাংলাদেশের আইনের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের ১৮ বছরের পূর্বেই এবং ছেলেদের ২১ বছরের পূবের্র বিবাহকে বাল্য বিবাহ বলে। এ ক্ষেত্রে নারীকে তার মানসিক প্রস্তুতির পূর্বে বৈবাহিক ও সন্তান গ্রহনের গুরু দায়িত্ব নিতে হয়।

বাল্য বিবাহ একদিকে আইন এবং সংবিধানের লংঘন, অন্যদিকে বাল্য বিবাহের বর ও কনেকে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়। যদিও দেশে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুরুষের ক্ষেত্রে ২১ বছর পূর্ণ এবং নারীর জন্য ১৮ বছর পূর্ণ হওয়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয় মেনে চললে তা বৈধ বিবাহ বলে গণ্য হয়।

বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের জন্য দায়ী মূলত এ দেশের প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দারিদ্র বাল্য বিবাহকে উৎসাহিত করে। দারিদ্রতার কারনে অনেক সময় বিবাহের বয়স হওয়ার পূর্বেই পিতা মাতা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠায়। এছাড়াও ইভটিজিং, যৌন হয়রানী, অশ্লীলতা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এজন্য পরিবার এসব অপ্রীতিকর ঘটনার হাত থেকে রেহাই পেতে মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেয়।

বাল্য বিবাহ পরিবার কেন্দ্রিক সমস্যা গুলোর মধ্যে অন্যতম। যা সমাজে একটি বিরাট প্রভাব ফেলে। এর কারনে একদিকে যেমন মানবিক জীবনের ক্ষতি সাধন হয় তেমনি সমাজে সৃষ্টি হয় বিরাট একটি সমস্যা। বাল্য বিবাহের কারনে সৃষ্ট সামাজিক সমস্যা গুলো হলো- বাল্য বিবাহ নারী সমাজের অভিশাপ স্বরুপ এবং নারীদের স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরুপও বটে। অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দানের সময় মেয়েদের মৃত্যু ঝুকি বেশী থাকে। এছাড়াও বাল্য বিবাহের কারনে নারী শিক্ষার অভাবে যথাযথ কর্মদক্ষতা অর্জন করতে না পারার কারনে নারীরা শ্রম বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। তাই তাদেরকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তাদের কোন স্বাধীনতা থাকে না। এতে তাদের উপর নেমে আসে নানা ধরনের অত্যাচার ও নির্যাতন।

বাল্য বিবাহ পারিবারিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। কারন বাল্য বিবাহ পরিবার কেন্দ্রিক সমস্যা গুলোর মধ্যে অন্যতম। বাল্য বিবাহের কারনেই মেয়েরা তাদের স্বাধীনতা হারায়। তাদের কোন ক্ষমতা থাকে না। আর এ কারনেই তাদের উপর নেমে আসে নানা ধরনের নির্যাতন যেমন- দাম্পত্য কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, আত্মহত্যা, হত্যাকান্ড, এসিড নিক্ষেপ সহ নানা ধরনের পারিবারিক সমস্যা। যার জন্য একমাত্র দায়ী বাল্য বিবাহ।

বাল্য বিবাহ একদিকে যেমন নারীকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তেমনি আমাদের সমাজকে বিরুপ ভাবে প্রভাবিত করছে। যা নারী, পরিবার, সমাজ তথা সমগ্র দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সামাজিক কুপ্রথা হিসেবে বিবেচিত হয়ে বাল্য বিবাহকে উৎখাতের জন্য অনেক উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারন করা হয়েছে। কিন্তু এ আইন এখনো জোরালো করা সম্ভব হয়নি। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করতে হলে এ আইন জোরালো করতে হবে। এছাড়াও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও নারী শিক্ষা ও নারীর স্বাবলম্বন অর্জনই পারে বাল্য বিবাহের অভিশাপ থেকে নারীকে মুক্তি দিতে।

আবার যৌন হয়রানীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলে কঠোর আইন প্রনয়ন করে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহন করে এ বিষয় মোকাবেলা করা যেতে পারে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে আগ্রহী হতে হবে। সর্বোপরী আমাদের সমাজে গণ-সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাল্য বিবাহ প্রতিরোধের সংগ্রাম সর্বদা অব্যাহত রাখতে হবে। বাল্য বিবাহের বিষয়টি আমাদের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আইনগত, রাষ্ট্রিয় ও সর্বোপরি সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে বিচার বিশ্লেষন করে সমন্বিত ভাবে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারলেই সমাজ থেকে এ সর্বনাশা প্রথা নির্মুল করা সম্ভব।

বাল্য বিবাহের উদ্বেগজনক পরিণতি যেহেতু পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সেহেতু এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

তাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহন বৃদ্ধি ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের উঁচুস্তর থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের; বিশেষ করে আমাদের রাষ্ট্র এবং প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সবার আগে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register