গুইমারার একটি ব্রীজ নির্মাণে হতে পারে নতুন দিগন্তের উন্মোচন গুচ্ছগ্রামে ৮২০টি বন্দী বাঙালিরা পরিবার ফিরে পেতে পারে তাদের বসতভিটা

এম শাহীন আলম, খাগড়াছড়িঃ

খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের বড়পিলাক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-১ সংলগ সাইংগুলিপাড়া খালে একটি ব্রীজের অভাবে যুগ যুগ ধরে দুটি ওয়ার্ডের প্রায় ৮ হাজার মানুষ, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাল পার হতে হচ্ছে। এছাড়া ঐ দুই ওয়ার্ডের বন্দোবস্তি প্রাপ্ত ৮২০টি বাঙ্গালী পরিবার হারাচ্ছে ভূমির দখল ও বসতবিটা। অপরদিকে যানবাহন চলাচলের খালটি বাধা হওয়ায় ঐ এলাকাটি গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক সংগঠন গুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয় অরণ্য। অসুস্থ রোগী এবং গর্ভবতীদের দুর্ভোগ চরমে। ব্রীজটি নির্মিত হলে বদলে যেতে পারে এ এলাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান। হতে পারে নতুন গিন্তের উন্মোচন। প্রসারিত হবে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ কৃষি, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের। নবসৃষ্ট গুইমারা উপজেলাকে উন্নয়নের মডেল হিসেবে রূপ দিতে এই ব্রীজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের বড়ইতলি, কুকিছড়া-নাক্রাই এ-দুই ওয়ার্ডের ৭টি গ্রামে প্রায় ৮ হাজার মানুষের বসবাস এখানে।এখানে ৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১২টি বৌদ্ধ বিহার, ৩টি হরিমন্দিরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন দূর্গম এ সব গ্রাম থেকে ১৪- ১৫ কি. মি. পায়ে হেঁটে উপজেলা সদরে আসতে হয় স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীসহ জনসাধারণকে। এলাকাটি কৃষি প্রধান হওয়ায় যাতায়াতের বিকল্প কোনো মাধ্যম না থাকায় নিজেদের উৎপাদিত ফসল কাঁধে করে গুইমারা বাজারে আসেন কৃষকরা। শুকঁনো মৌসুমে উৎপাদিত কলা, মৌসুমী ফল,শাক সবজি ইত্যাদি কৃষি পণ্যগুলো পায়ে হেঁটে কিংবা মোটরসাইকেলে করে বাজারজাত করতে পারলেও বর্ষাকালে সময়মতো বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। ফলে যেমনি ভাবে শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনগণকে তাদের উৎপাদিত কৃষি পন্য বাজারজাতসহ এ পথে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, তেমনি ভাবে যান চলাচলের ব্যাবস্থা না থাকায় সন্ত্রাসীরা এ অঞ্চলটিকে তাঁদের নিরাপদ অভয়ারন্য হিসেবে ব্যবহার করছে। বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোন আপদকালীন যথাসময়ে পৌঁছাতে না পারার কারণে অনেক সময় অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে এলাকাটিতে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গুইমারা উপজেলা সদরসহ দেশের অন্য কোনস্থানে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এ রাস্তাটি। এলাকাবাসীরা জানান,উৎপাদিত কৃষিপণ্যগুলো সময়মতো বাজারে নিতে না পারায় কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভবতী এবং মুর্মূষু রোগীকে চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। স্থানীয়রা বলেন, আধুনিকযুগে এসেও তারা যেন দেশের কোনো এক দ্বিপে বসবাস করছেন। কি কারণে সেতুটি নির্মাণ হয় না তা না জানলে ও তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, সরকার চাইলে নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে ব্রিজটি নির্মাণ করতে পারে।

হাফছড়ি ইউপি’র সাবেক মেম্বার মো: জহিরুল ইসলাম বলেন, ১৯৮০-৮১ সালে এই এলাকায় তৎকালিন সরকার বড়ইতলি মৌজাতে ২২০টিসহ ৮২০টি পরিবারকে পাঁচ একর তৃতীয় শ্রেণীর টিলাভূমি বন্দোবস্তি দিয়ে পূর্ণবাসন করেছিল। ১৯৮৬ সালে বিরাজমান পরিস্থিতির কারনে এসব পরিবারকে গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর গুচ্ছ গ্রামের থাকায় এবং যানবাহন চলাচলের কোন ব্যবস্থা না থাকায় নিরাপত্তাজনিত কারনে আমরা আমাদের বন্ধোবস্তি প্রাপ্ত জমি গুলো দেখবাল করতে বা আবাধ করতে পারছি না। ফলে আমাদের জমিগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে। সাইংগুলিপাড়া খালে একটি ব্রীজ নির্মানে আমাদের দীর্ঘদিনে দাবী ছিল। বিভিন্ন সময় আশ্বাস পাওয়া গেলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি।ব্রীজটি ণির্মিত হলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হবে এবং এলাকাটির দ্রুত উন্নতি ঘটবে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য সুইউ মারমা জানান, একটি ব্রীজ নির্মাণ হলে অবহেলিত এই জনপদ অনেক উন্নত হবে এবং যাতায়ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। একটি ব্রীজের জন্য অনেক পিছিয়ে আছে দুটি ওয়ার্ডের ৭ গ্রামের প্রায় ৮ হাজারের অধিক জনগোষ্ঠী।

এ বিষয়ে হাফছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান চাইথোয়াই চৌধুরী বলেন, ব্রিজটি নির্মাণের জন্য ১৯৯৭ এর দিকে এলজিডির মাধ্যমে তিনি একটি আবেদন করেছিলেন। মন্ত্রী কল্পরঞ্জন চাকমা অনুমোদন ও দিয়েছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে বিএনপি সরকার গঠন করায় প্রজেক্টটি বাতিল হয়ে যায়।এরপর এই এলাকায় ব্রীজ বা রাস্তা ঘাটের অদ্যাবধি পর্যন্ত কোনো উন্নয়ন হয়নি। তবে দ্রুততম সময়ে যাতায়ত ব্যবস্থা উন্নয়নে ব্রীজটিসহ রাস্তার ব্রিক সলিং নির্মাণের জন্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়ুয়া ব্রীজটি নির্মাণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই ব্রীজটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি ব্রীজটি নির্মাণের জন্যে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হবে বলেও জানান।

গুইমারা উপজেলা সদর থেকে খালটির অবস্থান ৩ কিলোমিটারের মধ্যে হলেও অদৃশ্য কারণে দীর্ঘদিনেও ব্রীজটি নির্মাণের যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যার কারণে পিছিয়ে আছে এই জনপদ। শুধু অবহেলিত দুর্গম এই জনপদবাসীর দাবী দ্রুতএই একটি ব্রীজ ণির্মানে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন কর্তৃপক্ষ।

মতামত দিন

0 Comments

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Don't have account. Register

Lost Password

Register